স্মরণিকা

-স্যার প্লিস স্যার, দশ তারিখের মধ্যে পরীক্ষাগুলো নিয়ে ছুটি দিয়ে দিন|
-আহ্ বলছি তো ভাবব, এখন যাও গিয়ে ক্লাস করো গে|
-স্যার একটু ভেবে দেখবেন স্যার প্লিজ, প্রায় পুরো ডিপার্টমেন্টের টিকিট দশ তারিখে কাটা আছে|
-আচ্ছা ঠিক আছে সে দেখা যাবে..তুমি ক্লাসে যাও এখন|
-আচ্ছা স্যার আসছি|
বাইরে এসে টের পেলাম ভিতরের এসির হাওয়া আদৌ কোনো কাজ করেনি মাথাটার ওপর| একে মিডসেমের সিলেবাস সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছি, তার ওপর সিআর হওয়ার গেরো| ইন্জিনীয়ারিং কলেজের স্টুডেন্টদের কথা ছেড়েই দিলাম, প্রিন্সিপালও এমন ঢ্যামনা হতে পারে আন্দাজ ছিল না কোনও| তার ওপর ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টরা তো আছে গাল খাওয়ার জন্যেই| সহানুভূতি তো দূরের কথা,পুঁছবেও না কেউ| বাপের জন্মে শুনিনি কেউ কোথাও দেবীপক্ষে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে| সেই কবে বাড়ি থেকে হস্টেলে এসেছি|কোথায় বাড়ি যাওয়ার জন্যে মনটা ছটফট করছে, আর এ কিনা…যাক গে,একবার হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম মোটামুটি তিনটে বাজতে চলল| বুঝলাম আর ক্লাস গিয়ে লাভ নেই| কলেজ থেকে বেরিয়ে সোজা হাঁটা লাগালাম হস্টেলের দিকে| যেতে যেতে চোখে পড়ল মাঠের সামনে বাড়িটার ছাদে ফুটে থাকা তিনটে মাত্র কাশফুলের দিকে| এমনিতে হয়ত খুব সাধারণ দৃশ্য, কিন্তু এই বছরের দেখা প্রথম কাশফুল বলেই বোধহয় মনটা আচমকা ভাল হয়ে গেল|

এবার বর্ষা একটু বেশি দেরি করেই বিদায় নিয়েছে| কিন্তু যেতে যেতেও সে তার ছাপ রেখে গেছে শরতের ওপর| অনেকেই হয়তো ভাববেন ঋতুদের আসা যাওয়া নিয়ে আমি এত ন্যাকা ন্যাকা স্টাইলে লিখছি কেন| আসলে ছোটবেলা থেকেই আমি এমনধারা প্রকৃতির| যে পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছিলাম সেখানকার সামাজিক পরিবেশ আর যাই হোক না কেন সুস্থ মনের বেড়ে ওঠার অনুকূল ছিল না| বন্ধুবান্ধব ছিল না তেমন কোন বিকেলে খেলতে বেরোতাম না বলে| ছোটবেলার দিনগুলো কেটেছিল প্রকৃতির সংস্পর্শে| আর বোধহয় তাই রাস্তার ধারে বসন্তে প্রথম ভাঁটফুল দেখলে, পুব আকাশে প্রথম বর্ষার মেঘ দেখলে, প্রথম শিউলিফুলের গন্ধ পেলে আমি কেমন যেন খুশি হয়ে যাই| আজ কাশফুলগুলোকে দেখেও ঠিক সেই অনুভূতি হল মনে|
সন্ধ্যেবেলায় হস্টেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এইসবই ভাবছিলাম| ভিতরে রুমে জোর আড্ডা বসেছে| অন্যদিন আমি থাকি মুখ্য বক্তা, আজ অনেক চাপাচাপিতেও যোগ দিইনি|
-কিরে কি হল তোর?
এই শুরু হল| দুদন্ড একা দাঁড়িয়ে থাকার জো নেই এখানে| ওমনি সব ধরে নেবে নির্ঘাত প্রেমে পড়েছে|
-হবে আবার কি? হাওয়া খাচ্ছি|
-উঁহু, হাওয়া খাওয়ার পাটি তো তুমি নও| কে সে?
-আবে নিজের কাজ কর গিয়ে যা না| তা না, খালি পিছনে লাগা|

গেল| আবার দুমিনিটে ফিরে চলেও এল| এই পিঙ্গলটাকে নিয়ে আমার হয়েছে মহা জ্বালা| কাজ কারবার নেই, সারাদিন আমার সাথে লেগে থাকবে| ওর মাথায় যা বুদ্ধি তার সিকিভাগও আমার নেই, তাও আমার মধ্যে যে কি দেখতে পায় ও তা ওই জানে| যতবার জানতে চেয়েছি কিছু না কিছু ছুতো দিয়ে ঠিক এড়িয়ে গেছে|

-চাপ নেই| ভিতরে যা লাগিয়ে এসেছি অন্তত আধঘন্টা কেউ আসবে না এদিকে| ঠিক করে বলতো কি ব্যাপার?
-প্রিন্সিপালের কান্ডটা শুনলি?
-হুম| তা তোকে তা নিয়ে ভাবতে কে বলেছে? যারা করেছে তারা বুঝবে তো|
-সিআরটা কে খেয়াল আছে?
-শালা যখন পইপই করে বারণ করেছিলাম শুনতে পাচ্ছিলি না? এখন নে সামলা!
-আরে তখন বুঝব কি করে এমনি কেলো করবে? কি করা যায় বল না|
-স্ট্রাইক ডাক|
-হ্যাঁ তাহলেই সব মিটে যায় কিনা| সামনে পরীক্ষা  মনে আছে? মাঝখান থেকে গাড্ডু খাইয়ে দিলে কপাল চাপড়ানো ছাড়া কিছু করার থাকবে না|
-তা তুই যেন স্ট্রিম টপার হবি মনে হচ্ছে?
-শালা মাথায় কাজের কোন আইডিয়া এলে বল নয়তো ফোট এখান থেকে|
-দেখছি ভেবে| আধঘন্টা পর আমার রুমে আসিস| অঙ্ক খানিকটা করতেই হবে|
-হুম|

পালাল| তা গেছে একদিকে ভালোই হয়েছে| নিরিবিলিতে চিন্তা করা যাবে কিছুক্ষণ| কি যে করি কিছুই মাথায় আসছে না| মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে রইলাম খানিকক্ষণ চুপচাপ| আচমকা দমকা হাওয়ায় ভেসে এল কোন ফুলের সুগন্ধ| খুব চেনা গন্ধ, কিছুতেই মনে করতে পারছি না| কি যেন নামটা?

-হ্যাঁরে খেতে দিয়েছে?
সম্বিত ফিরল|
-না বোধহয়| আচ্ছা এই গন্ধটা কিসের বলতো?
-ছাতিমফুলের| খেতে দিলে ডাকিস তো|
-আচ্ছা|

ছাতিমফুল! ঠিক এটাই মনে আসছিল না| মাঝে মাঝে অবাক লাগে,কত আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ স্মৃতিই না মনে কতটা জায়গা জুড়ে থাকে| বাংলাদেশে খুবই সাধারণ ফুল শরতকালের, কিন্তু তার সাথে যে আমার জীবনের এতদিনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় জড়িত,তা কিভাবে বোঝাই? ছবির মতন মনে পড়ে, ভোরের আকাশে ফিকে গোলাপী রঙ লেগেছে, শিশিরে ভেজা পাকা রাস্তার ধার দিয়ে ছোট্ট আমি যাচ্ছি বাবার পিছন পিছন হাতে প্লাস্টিকের প্যাকেট নিয়ে ফুল তুলতে| সদ্য ঝরে পড়া ছাতিমের তাজা সুগন্ধে বাতাস ভরপুর| শিউলি কুড়োতে কি উত্সাহ আমার তখন! মায়ের অন্জ্ঞলীর কাজে লাগবে,যত বেশি ফুল দেওয়া যাবে তত বেশি মা আমার কথা শুনবেন| আরো কয়েকজন আসত ফুল কুড়োতে| কম্পিটিশন হত আমাদের মধ্যে,কে কত বেশি ফুল কুড়োতে পারে|
সব থেকে কম যে পেত, সবাই নিজের ভাগ থেকে তাকে অল্প করে দিয়ে ঘরের রাস্তা ধরতাম| আর এখন? শালা নিজের ভাগ দেওয়া তো দূরের কথা,অন্যের ভাগ কমানোর দিকেই সবার নজর| নিজে তো মরবই, অন্যদেরও মারব|

-কিরে ডাকতে বলেছিলাম তো?
-কি হল?
-খেতে দিয়েছে| বেল শুনলি না?
-মেনু জানিস?
-বোধহয় মাংস হয়েছে| প্রতাপ বলল|
-চ’ গিয়ে আগে খেয়ে আসি তাহলে|

চিন্তাভাবনা সব শিকেয় তুলে চললাম খেতে| পিঙ্গলের সাথে আবার একপ্রস্থ লাগবে বোধহয়| আধঘন্টা পর যেতে বলেছিল আর যাইনি| যদিও ওর চাকর নই তবু কেন জানিনা ওর কথাগুলো মেনে চলতে ইচ্ছে করে| হয়তো খানিকটা কৃতজ্ঞতা আর খানিকটা সম্ভ্রমবোধেই| কতবার যে ছেলেটা আমায় উদ্ধার করেছে তা বলার নয়| গিয়ে দেখি আমার জন্যে লাইনে জায়গা রেখে দাঁড়িয়ে আছে|

-এলি না যে?
-আরে সময়ের খেয়াল ছিল না|
-কি এত ভাবিস বলতো তুই সবসময়?আমার তো ভাবতে গেলেই মাথা ধরে|
-পরীক্ষার হল ছাড়া|
-ইয়ার্কি নয়, সিরিয়াসলি বলছি| আরে তোকে সিআর বানিয়েছে বলে মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? খামোকা এত চাপ নেওয়ার কোন মানে হয়? মাংস হয়েছে, জমিয়ে খা, দিয়ে ঘরে গিয়ে মশারি খাটিয়ে ঘুম দে| কাল নটায় ক্লাসে চলে আসবি|
-কেন?
-এলেই বুঝবি|
ব্যাস চুপ মেরে গেল| খুব ভালো করে বোঝে কোন মাছ কি টোপ খায়| কিন্তু একটা কথা ঠিকই বলেছে| খামোকা অত টেনশন করে কোন লাভ নেই| খেয়েদেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ব বরং গিয়ে|

তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি…
ঘুম ভেঙে গেল| উঠে দেখি বাকি তিনজন রুমমেটই বেরিয়ে গেছে| ফোনটা তুলে দেখি পিঙ্গলের ফোন| এখন আবার কি দরকার কে জানে|

-হ্যালো|
-কি হ্যালো? কটা বাজে খেয়াল আছে? রোজ রোজ প্রক্সি মারতে পারব না|
-কটা বাজে?
-নটা চল্লিশ|

সর্বনাশ করেছে| তায় আবার প্রথম ক্লাসটা আজকে এসআরের| দেরি করে ঢুকলেই নো অ্যাটেন্ডেন্স বাঁধাধরা| কোনোরকমে তৈরি হয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে যখন ক্লাসে ঢুকলাম তখন সবে রোলকল শুরু হয়েছে| নিজের উপস্থিতি জানিয়ে বসলাম গিয়ে পিঙ্গলটার পাশে|

-থ্যাঙ্কস|
-রোজ রোজ ফোন করব না বলে দিলাম|শালা আমার ব্যালেন্স কমাতে খুব মজা লাগে না?
-আরে তোর রিচার্জ আমি করিয়ে দেব| কোনও আপডেট পেলি?
-পরে বলব| এখন চুপচাপ টুকে যা|

ক্লাস শেষ হতে না হতে সব হইহই করতে করতে এসে জুটল আমাদের বেঞ্চটায়|

-থ্যাঙ্কস ভাই|
-কি করে করলি বলতো?
-আজ সন্ধেয় ট্রিট ডিউ রইল তোর|
-বস তুই সেরা সিআর ভাই,কোনও কথা হবে না|

নানাবিধ ধন্যবাদের ঠেলায় খানিকক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলাম| অবশেষে পিঙ্গল আর প্রতাপই বের করে আনল আমায়| ওদের কাছেই শুনলাম, সমস্ত পরীক্ষা নাকি দশ তারিখের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হয়েছে| তাতে একদিনে দুটো পরীক্ষা পড়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সবাই অন্তত মহালয়ার আগে বাড়ি তো যেতে পাচ্ছে| জানতে পেরে মনে হল বুকের ওপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল| কালকের ঘ্যানঘ্যান করাটা তাহলে কাজে দিয়েছে| এবার শুধু পরীক্ষাগুলো
কোনমতে দিয়ে দিলেই হলো|

ট্রেন ধরব বলে আপাতত বসে আছি স্টেশনে| টোটোয় করে আসতে আসতে দেখছিলাম শহরটাকে| মফস্বল বলেই বোধহয় থিমপুজোর ব্যস্ততাটা এখানে নেই| আসতে আসতেই দেখছিলাম, বাঁশ দিয়ে পাতি প্যান্ডেলের কাঠামো বানানো হচ্ছে, আর তাতে দোল খাচ্ছে কচিকাঁচার দল| সেই পুরোনো পাড়ার পুজোয় যা আমরা করতাম| আজ সারাদিন ধরে মনটা খালি সেই ছোটবেলার পুজোর স্মৃতিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে, কেন কে জানে|

-তোর কি বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে নেই নাকি?
হুঁশ ফিরল অর্জুনের ডাকে|
-ট্রেন ঢুকছে| ব্যাগগুলো নিয়ে তৈরি থাক|
-হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে|
উঠে কোনওক্রমে ব্যাগগুলো সিটের তলায় চালান করে সর্বাগ্রে জানলার ধারটা দখল করলাম| প্ল্যাটফর্মের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম| রোহিতদা না? হ্যাঁ ঠিকই তো, রোহিতদাই তো ওটা| ডাকতে গেলাম,’রোহিতদা’…,কিন্তু তার আগেই লোকটা ঘুরে দাঁড়াতে সব সন্দেহের নিরসন হল| ওটা রোহিতদা নয়, অন্য কেউ|
আমার চমকে ওঠাটা যে ওরা লক্ষ্য করেছিল বুঝতে পারিনি| ঘুরে দেখি আমার দিকে সব তাকিয়ে আছে|

-কে ছিল রে ওটা?

ব্যাস| এই কায়দাটাই আমার বাজে লাগে পিঙ্গলের| যেই হোক,তোর কি রে বাপু! এমন চাউনি দিয়ে প্রশ্ন করবে যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না| আর সব জেনে নিয়েই খিল্লি করবে|

-বলতে পারি,কিন্তু কথা দে উলটোসিধা কিছু বকবি না তারপর?
-একদম না| প্রমিস| এই দিব্যি কাটছি|

বললাম| রোহিতদা ছিল আমার পাড়াতুতো দাদা| আমার ছোটবেলার হিরো| মেদহীন ঝকঝকে শরীর| প্রায় সমস্ত পুজোর ইভেন্টে অংশগ্রহণ করত আর কিছু একটা হতই| মনে আছে, একবার অষ্টমীতে ঢাকির শরীর খারাপ হলে তার জায়গায় ঢাক বাজিয়েছিল রোহিতদা| এই রোহিতদাই আমায় প্রথম পাড়ার পুজোর সমস্ত খুঁটিনাটি চিনিয়েছিল| মাধ্যমিকের পর যখন পাড়া ছেড়ে চলে আসি, আগের দিন দেখা করতে গিয়েছিলাম রোহিতদার সাথে| কাছে বসিয়ে মাসিমা, মানে রোহিতদার মা,পেট ভরিয়ে খাইয়েছিলেন| আর রোহিতদা আসার আগে আমায় দিয়ে দিব্যি খাইয়েছিল যেন যোগাযোগ রাখি|
তারপর নতুন পাড়ায় এসে প্রতিবেশীদের সাথে বনিবনা, নতুন স্কুলে ভর্তি, টিউশনি,উচ্চমাধ্যমিক,জয়েন্টের চাপে ভুলেই গিয়েছিলাম সেই স্বার্থ্বহীন মানুষগুলোর কথা| এখন কথাগুলো মনে পড়তেই ভীষণ অপরাধী মনে হল নিজেকে| মনে আছে,প্রত্যেক ঈদের পরবে রোহিতদা নিজে এসে আমায় বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাওয়াত| অবিশ্যি আমিও আমাদের পুজোর সময় ছাড়তাম না| নাহ্ এবার বাড়ি গিয়ে একবার দেখা করতেই হবে রোহিতদার সঙ্গে|
কথাগুলো বলছিলাম পিঙ্গলের দিকে তাকিয়ে| অর্জুন আর প্রতাপের দিকে তাকিয়ে দেখি দুটো হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে| এমন এক্সপ্রেসন মুখের যে না হেসে পারলাম না|

-সে কথা থাক,খাবারদাবারের কি হবে?
-সামনের স্টেশনে নেমে কিনে নেব|
-আচ্ছা বেশ|

তারপর সেই যে গুলতানি শুরু করল, তা থামল সেই একেবারে বর্ধমানে এসে| এমনিতে আমিও যোগ দিতাম,কিন্তু রোহিতদার আর সেই সুবাদে পুরোনো পাড়াটার কথা মনে পড়ায় মনটা ভারি হয়ে গিয়েছিল, তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলাম| তখন অস্ত যাওয়া সূর্যের শেষ আলো এসে দিগন্তের মেঘমালাকে রঙিন করে তুলেছে| তার ঠিক নীচে দিগ্বলয়রেখা অবধি বিস্তৃত কচি ধানক্ষেত, মনে করিয়ে দিল আবার সেই পুরোনো লাইনগুলো|
প্রতিদিন আমি, হে জীবনস্বামী…

নাহ্,আজ আর প্রতিদিন জীবনস্বামীর কাছে প্রার্থনা করা হয়না| আজ নিজের সম্মুখে দাঁড়ানোও হয়ে ওঠে না কাজের চাপে| আজ আছে শুধুমাত্র ইঁদুরদৌড়–নিজেকে পিষে ফেলার ইঁদুরদৌড়| পুজোয় কে কতজন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরবে, কত দামী জামা প্যান্ট পরবে,কত বেশি টাকা খরচা করবে এইসবের কম্পিটিশন|

-ভাবন কাজী বাবা,শুনছেন?
চমকে তাকালাম| কোথা থেকে যে সম্মোধনগুলো খুঁজে পায় কে জানে| হাসি পায় মাঝে মাঝে শুনলে|
-কি?
-কাল যে কিরকম বাঁশ মনে আছে?
-কিসের বাঁশ?
-কাল টেটের ডেট পড়েছে| লোকালে উঠতে পারবি?
-রিজার্ভ কর না|
-ওকে!

রাতে খেয়ে নেওয়ার পর আর একবার তাকিয়ে দেখলাম জানলার বাইরে| বাইরের জমাটি অন্ধকারে কিছু ঠাহর করা মুশকিল, তবু চুঁইয়ে আসা তারার আলো যেন সঙ্কেত দিচ্ছিল পুজোর আগমনীর|

-মা, ও মা|
-কি হল রে? চেঁচাচ্ছিস কেন?
-শোনো না,অনেকদিন রোহিতদার সাথে দেখা হয়নি| একবার যাবে আজকে?
-রোহিত?
-হ্যাঁ রোহিতদা| আরে ওই তো আমায় পুজোয় নিয়ে ঘুরতে যেত না–
-হ্যাঁ বুঝেছি…কিন্তু ও তো নেই|
-নেই মানে?কোথায় গেছে?
-আগের মাসেই তো ও মারা গেল|
-অ্যাঁ? কি বলছ?
-হ্যাঁ রে| ওই চৌমাথার মোড়টা পড়ে না স্টেশন যেতে, ওইখানেই অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল| কেন তোর বাবা বলেনি?
-কই না তো? আন্টিদের কি খবর?
-ওরা ওখানেই আছে| আহারে বেচারী মা, অত কমবয়সী ছেলে চলে গেল| তুই কি যাবি নাকি দেখা করতে একবার?
-দেখি|

গেলাম না আর| যাওয়া মানেই তো বৃথা বিড়ম্বনা বাড়ানো| তার থেকে না যাওয়াই ভালো| ছাদে এসে একবার তাকালাম আকাশটার দিকে| মনে পড়ল, একবার রোহিতদা আমায় ঘোরাতে নিয়ে গিয়ে বলেছিল,” বুঝলি ভাই, লাইফে তুই একেবারে একা| মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, এই তো আসল সাথী পেয়েছি জীবনের| আসলে তা একটা খেয়াল শুধু| একা এসেছিস,একা যাবি| দরকার খালি মাঝের সময়টুকুতে নিজেকে নিজেই তুলে ধরা|”
সেদিন বুঝিনি| বোঝার মতন বয়সও ছিল না তখন| কিন্তু আজ টের পেলাম কথাটা কতটা সত্যি ছিল| আফশোস একটাই, রোহিতদাকে দেওয়া শেষ প্রতিশ্রুতিটা রাখতে পারলাম না|

শিশির পড়ছিল| উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অসংখ্য তারার মাঝে অভিজিত তারাটা যেন বড় বেশি উজ্জ্বল| রোহিতদার বড় প্রিয় ছিল ওটা| আজ ভাবলাম, কত আলোকবর্ষ দূরে ওই তারাটা যেমন সাক্ষী ছিল রোহিতদার জন্মের, তেমনি সাক্ষী রইল তাঁর মৃত্যুরও|
দীর্ঘশ্বাসের সাথে বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটাই প্রার্থনা|
ভালো থেকো, রোহিতদা|

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s