ছায়ার দুর্গা

-আবার তুমি ওই ছাঁইপাশগুলো এনে দিয়েছ ওকে? একবার বারণ করলে কথা কানে যায় না?
-আরে বাবা একটা ইন্সট্রুমেন্ট বক্স বই তো কিছু নয়…লাগবে বলল…উপহার হিসেবে দিতে দোষ কোথায়?
-না একদম না| এদের একদম প্রশ্রয় দিতে নেই| আজ এই কিনেছে|কালকে…

পরিচয় দেওয়া যাক| উপহারপ্রাপ্ত ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে যিনি তিনি হলেন শ্রীমতি শোভাদেবী, পরিবারের গিন্নি| তাঁর শোভা থাকলেও সবসময় যে সুমতি বজায় থাকে এমন কথা হলফ করে বলা যায় না| অপরজন হলেন শ্রীযুক্ত কৌস্তভ রায়, পেশায় সফটওয়্যার ইন্জিনীয়ার| আর যাকে কেন্দ্র করে এই কলহ সে হল শ্রীমতি লাবণি রায়, ডাকনাম ছায়া| ছোটবেলা থেকেই তার ভালো লাগত বিভিন্ন কলকব্জা খুলে তার ভেতরকার ব্যাপারস্যাপার বুঝতে| আফশোসের বিষয়, বাপির তরফ থেকে যথেষ্ট উত্সাহ পেলেও তার এই শখে পদে পদে প্রধান বাধ সেধেছিলেন তার মা| রক্ষণশীলা শোভাদেবীর বিন্দুমাত্র সায় ছিল না তাঁর মেয়ের এই আগ্রহে| তিনি চাইতেন তাঁর মেয়ে ঘরকন্নার কাজ শিখে তাতেই পটু হোক| তবে কৌস্তভবাবু আর লাবণির যৌথ প্রতিবাদে তিনি মেয়েকে আটকাতে পারেননি নামী ইন্জিনীয়ারিং কলেজে ভরতি হওয়ার থেকে| ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় তুখোড় বুদ্ধিমত্তা লাবণির জন্যে মোটেই কঠিন ছিল না সেই পাওয়া| তার মতে বরং বেশী কঠিন তার মাকে বোঝানো তার নেশার ব্যাপারে|

যাই হোক, আমরা বরং আজকের ঘটনায় যাই| লাবণি তার বাপিকে বলেছিল তার ইন্সট্রুমেন্ট বক্সের দরকারের কথা| কপালদোষে সেটি এসে পড়ে শোভাদেবীর হাতে, আর তার থেকেই এই ঝগড়ার সূত্রপাত|

-আমি এই শেষ বলে দিলাম তোমায়…আর কোনদিন ছায়ার হাতে ওইসব দেখলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব তক্ষুনি|
আপাতত রণে ভঙ্গ দিলেও কৌস্তভ বিলক্ষণ জানতেন, এতে না তাঁর স্ত্রী না মেয়ে, কেউই ক্ষান্ত হবার নয়|


আজ মহাষষ্ঠী| দেবীর অকাল বোধনের দিন| সারাদিন ধরে কৌস্তভ ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন সেই কাজে| বিকেল নাগাদ তিনি হালকা হলে ঘরে এসে গা এলিয়ে দিলেন তাঁর আরামকেদারায়| খানিকক্ষণ বিশ্রাম করেছেন এমন সময় তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালো ছায়া| অভিজ্ঞ কৌস্তভ লক্ষ্য করলেন, তাঁর মেয়ের চোখদুটো যেন আজ অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল|

-কিছু বলবি মা?
-হ্যাঁ বাপি| তোমায় বলেছিলাম না, এবার আমি নিজের ঠাকুর বানাবো আমায় বক্সটা এনে দিলে?

মনে পড়ল তাঁর| নিছকই কৌতূহলবশত তিনি তাই কিনে দিয়েছিলেন ওটা|

-হ্যাঁ হ্যাঁ,মনে আছে| তা তুই বানিয়েছিস নাকি?
-হ্যাঁ বাপি| তুমি একটা কাজ করে দেবে?
-কি কাজ?
-এবার যে ‘পাড়ার সেরা ঠাকুর’ প্রতিযোগিতাটা হচ্ছে না, তার বিচারককে আনতে পারবে? আমি তাতে পার্ট নিতে চাই|
-আচ্ছা দেখি দাঁড়া|

খানিকক্ষণ পড়ে বিচারককে নিয়ে ছায়ার সাথে কৌস্তভ বাড়ির গ্যারাজে গিয়ে দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য| ছায়া বিভিন্ন
যন্ত্রপাতি, ভাঙা কাঁচের টুকরো ইত্যাদি দিয়ে একটা অদ্ভুত মডেল তৈরি করেছে| অথচ তাকে কোনভাবেই দুর্গামূর্তি বলা যায় না| সেখানে ছায়ার আরো পাড়ার বন্ধুরা আগের থেকেই বসে| এমনকি শোভাদেবীও উপস্থিত| ছায়া সবাইকে বসতে বলে নিজে গিয়ে দাঁড়ালো মডেলটার পাশে|

  • আমার দুর্গামূর্তি দেখানোর আগে তার সম্পর্কে কটা কথা বলতে চাই আপনাদের| আমার দুর্গা মাটির তৈরি নয়,আলোর তৈরি| আর্থিক পুঁজির অভাবে আমি হয়ত যথাযথ আলোর ব্যবস্থা করতে পারিনি, তবে আমার দুর্গাকে দেখানোর জন্যে যতটুকু দরকার, তা আছে| আপনারা হয়তো ভাবছেন কোথায় দুর্গামূর্তি| আসুন, দেখাই|

এই বলে ছায়া সমস্ত লাইট বন্ধ করে শুধু মডেলটার উলটোদিকের একটা আলো জ্বালিয়ে দিল| সবাই অবাক হয়ে দেখল, মডেলটার ছায়া পড়েছে দেয়ালের ওপর| আর তা আর কিছুই নয়, সিংহবাহিনী দশভুজার আকার|

খানিকক্ষণের স্তব্ধতা মাত্র| তারপরেই হাততালির আওয়াজে ভরে গেল গোটা ঘর| হাততালি দিতে দিতে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন কৌস্তভ, শোভাদেবীর চোখে জল| বুঝলেন, আজ তাঁর ঘরেও অকাল বোধনের দিন| এতদিনে হয়তো তাঁর স্ত্রী বুঝেছেন তাঁর মেয়ের আনন্দ কিসে| ওদিকে বিচারক আর ছায়ার বন্ধুরা তখন ছায়াকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত| মেয়ের আনন্দিত মুখের দিকে তাকিয়ে কৌস্তভ মনে মনে বললেন, তাঁর সংসারে যেন চিরদিন এমনিই দুর্গার ছায়া থাকে|

 

Advertisements

2 thoughts on “ছায়ার দুর্গা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s