আগুনের পরশমণি

মৃত্যুর ছায়াঢাকা বাড়িটার ভেতর আর বসে না থাকতে পেরে বাইরে বেরিয়ে এল ঋজু। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে পাঁচটা বললেও এর মধ্যেই মোটামুটি অন্ধকার হয়ে এসেছে চারপাশে। ত্রিফলা আলোগুলো জ্বলে উঠছিল এক এক করে। তবে রাস্তার আলো জ্বললেও আজ ঋজুর জীবনে একটা আলো চিরতরে হারিয়ে গেছে।

-সরি স্যার, উনি আর নেই।

কটা মাত্র শব্দ। কিন্তু তাই মানুষকে ভেঙে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। আত্মীয়স্বজন মারা গেলে যত না কষ্ট, নিজের আপন দাদা চলে গেলে তার চতুর্গুণ। তাও আবার সেই দাদা যদি হয় নিজের ধ্যান জ্ঞান মান। চাকুরিরত বাবামায়ের সময় ছিল না ছোটছেলেকে দেখার। অগত্যা ঋজুকে সামলানোর পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে রূপমের ওপর। খুশি মনে যে লোকটা মেনে নিয়েছে তার সমস্ত আবদার, পাশে থেকে হাত ধরে তাকে পথ চলা শিখিয়েছে, তাকে আর দেখা যাবে না ভাবতেই জ্বালা করছিল চোখদুটো।

নাহ্, আর দাঁড়াল না ঋজু। বলা ভাল, দাঁড়াতে পারল না। দাদার স্মৃতিজড়িত বাড়িটার থেকে যতটা সম্ভব দূরে যেতে চায় সে। আচ্ছন্নের মতন হাঁটতে লাগল মেন রোড ধরে। পাশ দিয়ে যে হুশ হুশ করে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে সেদিকে যেন খেয়ালই নেই তার।

আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে…
গমগমে গানের লাইনটা কানে আসতে সম্বিত ফিরল ঋজুর। সামনেই বিরাট শপিং মল। ঝলমলে আলোয় সাজা মাল্টিপ্লেক্সের পরতে পরতে যেন দীপাবলীর আগমনী। তার ঠিক নিচেই বসেছে বাজির বাজার। আমোদপ্রিয় বাঙালীর বাজি কেনার ব্যস্ততা তুঙ্গে।

-না না এভাবে নয়, আগের অঙ্কটার মতন করে কর।
কানে কথাটা আসতে ঘুরে তাকিয়ে দেখল ঋজু। ফুটপাথের ওপর ছেঁড়া চালের বস্তা পেতে বসে একটি দশ-বারো বছরের ছেলে, তার সামনে বসে আরও চার-পাঁচজন। পড়াচ্ছে না কি? হ্যাঁ ঠিক, ওই তো, খাতার ওপর লেখা- দশমিকের ব্যবধান.…
অনুভব করল ঋজু, তার মধ্যে জমে থাকা কষ্টটা ক্রমশ পরিণত হচ্ছে উপলব্ধিতে। দীপাবলী। অন্ধকার তাড়ানো আলোর উত্সব। একটা জীবন চলে গেল তো কি হয়েছে, এই অন্ধকারের মধ্যেও পাঁচটা নতুন জীবনকে আলো দিতে ব্যস্ত একজন। যে আলো নেভার নয়। নিজের অজান্তে সে কখন ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সেও টের পায়নি। পকেট হাতড়ে  যে কটা টাকা পেল সব বের করে বাড়িয়ে দিল ছেলেটার দিকে।

-এই নে, এটা দিয়ে বাচ্চাগুলোকে কিছু খাতা পেন্সিল কিনে দিস।
-আচ্ছা স্যার, বলে বাচ্চাগুলোর দিকে ঘুরে বলল, এই তোরা স্যারকে সবাই থ্যাঙ্ক ইউ বল।

আধো আধো কচি গলার কতগুলো অসংলগ্ন ধন্যবাদ ভেসে এল ঋজুর দিকে।

Advertisements

2 thoughts on “আগুনের পরশমণি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s