পর্ণমোচন

#
ধূলিধূসরিত গোধূলি নামল দিগন্তপারে|
আরও একটা দিন চলে গেল, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন সালেমা বিবি| তাঁর ছেলে আজও ফিরল না| আশায় আশায় তিনি পথ চেয়ে বসে থাকেন, রাঙা মাটির রাস্তা যেখানে মিশে গেছে পিচ ঢালা সড়কের সাথে| বছরের শেষ দিনেও শান্তির আলো পেলেন না খুঁজে তিনি| কোনো মিলিটারি গাড়ি এসে দাঁড়াল না তার বাড়ির সামনে| ছেলে রফিকুল সৈন্যদলে যোগ দিতে যাবার আগে বলেছিল তাঁকে,
-আমি তোমার জন্যে ঠিক ফিরে আসব আম্মি,দেখে নিও|
চোখের জল আগলে ছেলেকে বিদায় জানিয়েছিলেন সালেমা| একরাশ ধুলো উড়িয়ে গরবীনি মায়ের ছেলে চলে গিয়েছিল দেশের জন্যে নিজের জীবন বাজি রাখতে|
সালেমার স্বামী নেই| রফিকুলের ছোটভাই আহমেদের জন্মের পরে পরেই তিনি দুর্ঘটনায় মারা যান| দুবেলা মুড়ি-চিঁড়ে ভেজে কায়ক্লেশে সালেমা টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন সংসারটাকে, তাও এটা অজ পাড়াগাঁ বলে| অভাবী মায়ের দুঃখ ঘোচাতেই রফিকুল নিজের জীবন দাঁওয়ে রেখে পাড়ি দেয় দেশান্তর| রফিক চলে যাওয়ার পরে বুকে পাথর বেঁধে সাত বছরের আহমেদকে মানুষ করতে থাকেন সালেমা|
-আম্মা, ভাইয়া কবে ফিরবে?
প্রায় এক বছর হতে চলল রফিকুল ঘরছাড়া| দাদা চলে যাওয়ার পর থেকে রোজ অবুঝ আহমেদের এক প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন সালেমা| তবুও ছোটছেলেকে বোঝাতে চেষ্টা করেন| কথাচ্ছলে ভুলিয়ে রাখেন তাকে| সাঁঝবেলায় কুপি জ্বেলে ঝাঁপি খোলেন একচিলতে দোকানের| হুহু করে উত্তুরে হাওয়াকে ভালো করে আটকাতে পারে না তাপ্পি লাগানো শালটা| তাই নিজে গায়ে দিয়ে ছোটছেলেটার গায়ে একটা পুরোনো সোয়েটার পরিয়ে মায়ে-পোয়ে উনুনের কাছে বসে থাকেন আঁচটুকু সেঁকে নিতে| একজন দুজন করে পড়শিরা এসে ভিড় জমায় দোকানে, গালগল্পে কেটে যায় বাকি সন্ধ্যাটুকু| আরেকটু রাত হলে দোকান বন্ধ করে, আহমেদকে খাইয়ে, নিজে খেয়ে, আল্লাহর কাছে বড়ছেলের জন্যে দোয়া করে ঘুমিয়ে পড়েন সালেমা বিবি|

 

#
গভীর রাতে ক্যাম্পের তাঁবুর বাইরে এসে আকাশটার দিকে তাকিয়েছিল সে| এই দূরদেশে, বছরের শেষ রাতে খুব মনে পড়ছে তার, তার আম্মির কথা, তার ছোট্ট ভাইটার কথা| সামনেই একটা নাম না জানা গাছ| কনকনে উত্তুরে হাওয়ার দাপট সইতে না পেরে ঝরিয়ে চলেছে তার পাতাগুলো| ঝরা পাতা মাঝে মাঝে এসে আটকাচ্ছে তার গায়ে, আবার উড়ে চলে যাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে উপত্যকায়| বিস্তৃত এই উপত্যকার একদিকে তারা, অন্যদিকে শত্রুদলের ঘাঁটি| যে কোনো মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে তারা|

-রফিক|
তার পার্টনার অনল|
-হুম|
-কম্যান্ডার ডাকছেন সবাইকে, চলো|
-হাঁ চলিয়ে|

-আজ রাতেই আমরা অ্যাটাক করব| সবাই মন দিয়ে নিজের জায়গা বুঝে নাও| কাল থেকে নতুন বছরের শুরু হচ্ছে, আমরা দেশবাসীকে নয়া সালে….

কম্যান্ডারের কথা মতন আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নিতে রফিক আম্মি আর আহমেদের কথা মনে করে নিল| তারপর
টানটান হয়ে পোজিশন নিল গাছটার পাশে| তার কাজ ঘাঁটি রক্ষা করা| অল্পক্ষণ পরেই বিস্ফোরণের আওয়াজে কেঁপে উঠল চারপাশ| পুরোদমে আঘাত হেনেছে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনী| তাজা বারুদের গন্ধ মিশে গেল ঠান্ডা হাওয়ার সাথে|
অপেক্ষা করছিল রফিক| কখন তেরঙ্গা ঝান্ডা উড়িয়ে তার সাথীরা বিজয়োল্লাস করতে করতে ফিরবে| তারি মধ্যেও তার পেশী টানটান, স্নায়ু সজাগ| তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় আচমকা অনুভব করল তার খুব কাছেই কোনো নড়াচড়া| ভালো করে লক্ষ করে বুঝল সে, শত্রুপক্ষের কেউ তাদের ঘাঁটি ভেদ করার চেষ্টায় আছে| সেও ততক্ষণে রফিককে দেখতে পেয়ে গেছে| একমুহূর্ত দেরী না করে নিশানা লাগিয়ে গুলি ছুঁড়ল রফিক| অস্ফুট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল তার শত্রু| এটুকুই দেখতে পেল রফিক| পরমুহূর্তে অন্ধকার ভেদ করে শেলের টুকরো ছুটে এল তার কলজের দিকে| ইউনিফর্ম ভিজে গেল তাজা তরুণ রক্তে| মোক্ষম লক্ষ্যভেদ| বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল প্রাণঘাতী কার্তুজ| রফিকের নিথর দেহ পড়ে রইল সেই নাম না জানা গাছটার তলায়| ঝরাপাতার রাশি উড়ে এসে স্পর্শ করে যেতে থাকল এক অভাগী মায়ের সন্তানকে| ওদিকে তখন ভারতীয় বাহিনী নিজেদের যুদ্ধজয়ে উল্লসিত|

দিগন্ত রাঙিয়ে সূর্য উঠল, নতুন বছরের|

 

Advertisements

5 thoughts on “পর্ণমোচন

  1. পিংব্যাকঃ Leaves fall… – Bong Stories II

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s