বৃষ্টিফুল

মেঘের ছায়া ঘন হয়ে এসেছে ঘরটার ভেতর। অধৈর্য হয়ে পেনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল তিস্তা। কাঁহাতক আর অপেক্ষা করা যায়! রাস্তায় একবার উঁকি মেরে দেখল, অরণ্যটার কোন পাত্তা নেই। এদিকে আকাশের যা অবস্থা, যে কোন মুহূর্তে বৃষ্টি নামল বলে।

অরণ্য তিস্তার ছোট্টবেলার বন্ধু। একসাথে ওদের বড় হয়ে ওঠা। স্কুল থেকে কলেজ অবধি। আশ্চর্যের বিষয়টা হল, হাবভাবে দুই বন্ধু একেবারে বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তিস্তার ঘরে গেলে দেখা যাবে দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের ছবি টাঙানো, পরিপাটি বিছানা, তার পাশে পড়ার টেবিল, সব কিছুই জায়গামাফিক সাজানো। তিস্তা নিজেও সাবধানী প্রকৃতির। ভেবেচিন্তে দেখেশুনে নিজের পা ফেলতে পছন্দ করে। অন্যদিকে অরণ্য ঠিক তার উলটো। খামখেয়ালী স্বভাবের। পাগলাটে। দামাল প্রকৃতির। একবার মাথায় কিছু ঢুকলে সেটার শেষ না দেখে ছাড়বে না। তার ঘরে গেলে যদি মনে হয় সেখানে গতকাল রাম-রাবণের যুদ্ধু হয়েছিল, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। গোটা ঘর লন্ডভন্ড অবস্থায় থাকে সারাক্ষণ। এহেন দু’জনের মধ্যে যে কিভাবে বন্ধুত্ব হল, তা বোধহয় বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরাও বের করতে পারবেন না।

মধুলিকা ক্লাসে ঢুকলেই মনটা খুশি হয়ে যেত অরণ্যর। যেদিন আসত ক্লাসে, সেদিন অরণ্যর চোখে সকলি শোভন। রাস্তার ধারে ছাগলের পটি করা দেখতে ভাল লাগে, সিগনালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভোঁতা মাইকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভাল লাগে, মায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে গলদঘর্ম হতেও ভাল লাগে। অথচ শুরুতে যখন আলাপ হয়েছিল ওর সাথে তখন এই অবস্থা হবে নিজের তা বেচারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
সেদিন খুব সম্ভবত তখন ইংলিশ পিরিয়ড চলছিল। আর ক্লাস টুয়েলভে পড়া ছেলেদের ইংলিশ পিরিয়ড কেমন লাগে আশা করি পাঠক/পাঠিকাদের আর বলার দরকার নেই। খালি মনে হয় কখন শেষ হবে। এদিকে ইংলিশ বই ছেড়ে অন্যদিকে মন দেওয়া মানে নিজে সেধে বাঘের গুহায় মাথাটি গলানো। তায় আবার আগের দিনই আবার অরণ্যর জায়গা পাল্টেছিলেন এই টিচারটি। বেশি বিরক্ত করার অভিযোগ। অগত্যা নাচার হয়ে বসে বসে বইয়ের ছবি শেড করছিল সে। এমন সময়ে পাশের থেকে
-এই তুই কি করছিস বলত!
সাড়ে সবর্নাশ। শালা সব মেয়েগুলোই ছেলেদের সাথে এমনি করে কেন কে জানে। কি ভাগ্যি টিচার শুনতে পাননি কথাটা।
-তোর কি?
-আমার অসুবিধা হচ্ছে স্যারের কথা বুঝতে।
– কি মুশকিল! আমি কথা তো বলিনি!

কান বটে স্যারের। ওই ফিসফিসানিও ঠিক শুনতে পেয়ে গেছেন। পরক্ষণেই হুঙ্কার,
-আর একবার যদি কথা বলতে দেখি দুজনকেই ক্লাসের বাইরে বের করে দোব।

বেশ।  ক্লাসজুড়ে খুকখুক করে খানিক হাসির পর কথা চলল খাতার শেষ পাতায় লিখে লিখে। কি কথা হল সেসব বলে লাভ নেই, অল্পবিস্তর সবাই আন্দাজ করতে পারবেন আশা করি। ফলাফল, পরেরদিন থেকে অরণ্যর মতন ছেলে সবার আগে ক্লাসে হাজির, আর সেদিন থেকে হান্ড্রেড পারসেন্ট অ্যাটেন্ডেন্স। টিফিন ব্রেকে খেলার কোন এক ফাঁকে গিয়ে মধুলিকার টিফিনে ভাগ বসিয়ে আসা, রাত জেগে হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুকে চ্যাটিং, মাঝেসাঝে টিউশনি কামাই করে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া, ইম্প্রেশন জমাতে বন্ধুদের থেকে টিপস নেওয়া, ঠিকঠাকই এগোচ্ছিল সব। কিন্তু ওই, বেশিরভাগ সময়ে যা হয়! অরণ্যও বাদ পড়ল না তার থেকে। তিনবছর পরে হঠাৎ একদিন বিকেলবেলায় মধুলিকা ডেকে পাঠাল অরণ্যকে।
-তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।
ব্যস ওইটুকুই যথেষ্ট। বাকিটা বলার প্রয়োজন নেই। আর কেউ না হোক, সেদিন বিকেলের গোলাপী আকাশটা দেখছিল তাকিয়ে তাকিয়ে, রাস্তার ধারে ফুটপাথ দিয়ে একটা দামাল ছেলে মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছে।

গতকাল মধুলিকার সাথে অরণ্যর ব্রেকআপ হয়েছে। আজকের গল্পে ফিরে আসা যাক। বেচারি তিস্তা অপেক্ষা করতে করতে প্রায় ক্ষেপে উঠেছে এমন সময় আকাশ ভেঙে নামল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।

-ওই যাঃ, গেল আজ টিউশনি মায়ের ভোগে। আয় আজ, হিসেব নিচ্ছি তোর আমি।
দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আরেকবার ফোন লাগাল। নাঃ, সেই নাম্বার ইজ সুইচড অফ। এবার সত্যি পাগল হয়ে যাবে ও।
তিস্তা দাঁড়িয়েছিল জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে। ওর রুমটার জানলার বাইরে কি একটা ফুলের গাছ হয়েছে। হালকা হলুদ রঙের পাপড়ি, ভারি মিষ্টি গন্ধ। নাম জানে না, বৃষ্টির সময় ফোটে বলে ও নাম দিয়েছে বৃষ্টিফুল। এখন গাছটায় কুঁড়ি এসেছে। তার দিকে তাকিয়েই তন্ময় হয়ে ছিল ও। বাড়ির দরজায় কখন কলিং বেল বাজল, কখন তার মা গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছেন তার খেয়াল নেই। নিজের রুমের দরজায় খট করে দরজা খোলার আওয়াজে চমকে পিছন ফিরে তাকাল।
অরণ্য ঢুকছে। এক্কেবারে কাকভেজা অবস্থা। গাঢ় নীল জামাটা শরীরের সাথে লেপটে আছে। মাথার চুলগুলোর থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। দেখতে পেয়েই তিস্তা রে-রে করে তেড়ে গেল ওর দিকে।

-এতক্ষণে তোর আসার সময় হল? কি রে তুই? কাল থেকে কোন পাত্তা নেই কিছুনা…আর এই বৃষ্টিতে ছাতা ছাড়া এসেছিস? কি অবস্থা হয়েছে নিজের দেখ তো?
অরণ্য নিস্পন্দ চোখে তাকাল ওর দিকে। অদ্ভুত শূন্য চাউনি। তারপর বলল,
-কাল আমার আর মধুর ব্রেকআপ হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তিস্তা। তারপর বলল,
-হয়েছে ভালোই হয়েছে। ড্যাং ড্যাং করে ওর পেছনে যাওয়ার আগে আমার কথাটা শুনলে আজ এটা হত না। তুই জানতি যে তুই ছাড়াও ও অনির্বাণের সাথে ঘুরে বেড়াত?
অনির্বাণ অরণ্যর বেস্ট ফ্রেন্ডদের মধ্যে একজন। এতক্ষণ মাথা নিচু করে শুনে যাচ্ছিল।  এবার অবাক হয়ে তাকাল তিস্তার দিকে।
-কি বলছিস কি? অনির্বাণ কে হয় আমার তুই জানিস?
-জানি বলেই বলছি। আর এতে অনির্বাণেরও কোন দোষ নেই, মধুলিকা তোর মতই ওকে তোর ব্যাপারে কিসসু বলেনি।
-তাহলে এতদিন বলিসনি কেন?
-তোর তো আমার কোন কথাই বিশ্বাস হয় না। আর তাছাড়া তোর ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি নাক গলাবই বা কেন?

এতক্ষণ কোনরকমে নিজেকে ধরে রেখেছিল অরণ্য। এবার তিস্তাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।
-সব ব্যাপারেই তো নাক গলাস। এটা একবার বলতে কি হয়েছিল?
-বললাম তো এখুনি।
– আমি ওকে প্রোপোজ করার আগে বলতে পারিসনি?
আবার খানিক্ষণ চুপ করে রইল তিস্তা। তারপর আস্তে আস্তে নরম স্বরে বলল,
-বলিনি, কারণ আমি দেখতে চেয়েছিলাম তুই কতটা রোম্যান্টিক ভাবে প্রোপোজ করিস।
-কেন?
-যাতে আমি তার থেকেও রোম্যান্টিক্যালি প্রোপোজ করতে পারি তোকে।
আলিঙ্গন ছেড়ে তিস্তার মুখের দিকে হাঁ করে তাকাল অরণ্য। যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে এমন চাউনি তিস্তা গম্ভীর হতে চেয়েও ফিক করে হেসে ফেলল।
-কি হল? অবাক হলি নাকি? তোকে অবশ্য বহুদিন আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছি, কিন্তু তুই এমন উঁচুদরের গাধা, বুঝেও বুঝিস না। তাই দায়িত্বটা আমাকেই নিতে হল। এসব কাজ মেয়েদের করতে হয়? তবে হ্যাঁ,মধুলিকার ঘটনাটা কিন্তু পুরো কোইন্সিডেন্স। আমার ওতে কোন হাত নেই।
-তু…তুই আমাকে…
কথা আটকে গিয়েছে বেচারার।
-হ্যাঁ।
-কিন্তু আমি তো তোকে…
আবার রে-রে করে তেড়ে উঠল তিস্তা।
-বলে দেখ। জুতোপেটা করব তখখুনি।
জড়িয়ে ধরল আবার তিস্তাকে অরণ্য।
-থ্যাঙ্ক ইউ।
এবার আর কান্না নেই ওর চোখে, কিন্তু তাও ফুঁপিয়ে চলেছে। তিস্তা বাধা দিল না। কেঁদে নিক আজ ছেলেটা। কারণ ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে, আর কোনওদিনও ও অরণ্যকে কাঁদতে দেবে না।

বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল, ওর বৃষ্টিফুল ফুটে যেন ওদের জীবনের নতুন অধ্যায়কে স্বাগত জানাচ্ছে।

 

বিঃ দ্রঃ: গল্পটির ধারণা এক বিশিষ্ট বন্ধুর দেওয়া, পরিচয় গোপন রাখতে পইপই করে বলে দিয়েছে অগত্যা সে অনুরোধ রাখতে বাধ্য হলুম।

Advertisements

2 thoughts on “বৃষ্টিফুল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s