এভাবেও ভালবাসা যায়

চৈত্রমাসের শেষ দিকের দুপুরে শ্রাবণী সেনের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার মধ্যে একটা বেশ আলাদা আমেজ আছে। অন্তত তেমনটাই মনে হয় নীপার। নিঃঝুম দুপুরে দূর থেকে ভেসে আসা কুহু কুহু ডাকে, ঘড়ঘড় করে ঘুরতে থাকা ফ্যানের ব্লেডের আওয়াজের সাথে ‘এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে’- আহা! পারফেক্ট মন ভালো করা আবেশ এনে দেয় একটা।

কিন্তু নীপার মন ভালো নেই। আর এই ভালো না থাকাটা একদিনের গপ্পো নয়, বহুদিন ধরে জমে থাকা রাশি রাশি বঞ্চনা, অভিমান, আক্ষেপের ফলাফল। মেজাজটা আরও তেতো হয়ে গেল কারেন্টটা চলে যাওয়ায়। ভ্যাপসা গরমে ঘরে না থাকতে পেরে দরজা খুলে ব্যালকনিতে বেরিয়ে এল ও। চারদিক চুপচাপ, মাঝে মাঝে ক্রিংক্রিং করে সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে কয়েকজন পেরিয়ে যাচ্ছে, আর গরম হাওয়া পাক দিয়ে উঠে এসে সেঁকে দিচ্ছে শরীরটাকে।

নীপার বড় হয়ে ওঠা রক্ষণশীল পরিবারে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঁধা গতানুসারে সেও প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিল। অন্য কোনদিকে মন না দিয়ে শুধুমাত্র পড়ার বই মুখে বসে থাকা দিনরাত। থার্মোডায়নামিক্স অর্গ্যানিক ক্যালকুলাসের টিউশনির বেড়া দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হত ওর সারাদিন। পড়তে চাইত, কিন্তু পারত না। কারণটা অংশু। ওর ব্যাচমেট। ক্লাসে এমন মেয়ে নেই যে ওকে নিয়ে পাগল নয়। অসম্ভব হ্যান্ডসাম দেখতে। এমনকি ওর কাছের বন্ধুগুলো পর্যন্ত ওর বন্ধু হতে পেয়েছে বলে ঘ্যাম নিয়ে চলে। সাধারণত দেখা যায় এই ধরণের ছেলেরা একটু হলেও নাকউঁচু টাইপের হয়। অংশুর সেসবের বালাই নেই। সবার সাথে খোলা মনে মিশতে পারে। ক্লাসে প্রথম দশজনের মধ্যে থাকতে পারে। অনায়াসে গোটা ক্লাসের হয়ে দায় নিয়ে নিতে পারে। টিউশনিতে আর্দ্ধেক দিন আসত অগোছাল ভাবে। একমাথা এলোমেলো চুল, জামার বোতাম উলটোপালটা লাগানো, মুখে কোনরকমে কামানো দাড়ির ওপর আফটারশেভের সুগন্ধের আভাস। স্বাভাবিকভাবেই যদি কোন মেয়ের পাশে দৈবাৎ বসত পরেরদিন ক্লাসে তার একটু কেতা বেড়ে যেত। আর পাঁচটা মেয়ের মতন নীপাও স্বপ্ন দেখত ওর। ওই বাঁধাধরা জীবনযাত্রায় ওইটুকুই ছিল ওর মুক্তি।
একদিন অংশু কিভাবে যেন জেনে গিয়েছিল ও গান শেখে। সেদিন বহু চাপাচাপিতেও নীপা রাজি হয়নি ক্লাসভর্তি লোকের সামনে গান গাইতে। পরদিন সাতসকালে অংশু ওদের বাড়ি এসে হাজির। ওর মা তখন বাগানে ফুল তুলছিলেন। গেট দিয়ে ঢুকে ওর মাকে প্রণাম করে বলে কি,
– কাকিমা, কাল আপনার মেয়ে ক্লাসে গান শোনাতে রাজি হয়নি। তাই আজ সকাল সকাল একা চলে এসেছি ওর গলায় গান শুনব বলে।
ওর মা তো অবাক! তাড়াতাড়ি মেয়েকে ডেকে পাঠালেন। ঘুমচোখে নিচে নেমে অংশুকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল ও। মা-বাবার সাথে আলাপ করিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অংশুকে নিজের ঘরে। পরপর গান গেয়ে গিয়েছিল প্রাণ খুলে। আর অংশু চুপ করে বসে শুনে গিয়েছিল। শেষে বলেছিল,
-এবার থেকে যখনই সময় পাব চলে আসব তোর গান শুনতে। এত ভাল গাস, স্কুলের ফাংশনে নাম দিসনা কেন?
খুশিতে উপচে পড়েছিল ওর মন। বলেনি কাউকে। তারপর থেকে অংশু প্রায়ই আসত ওর বাড়িতে। নীপার মা ওকে স্নেহ করতেন খুব। দিব্যি কাটিয়ে নিয়েছিল ওকে দিয়ে নীপা, এসবের ব্যাপারে যেন স্কুলে কেউ জানতে না পারে।
তারপর ছ’টা মাস কোথা দিয়ে কেটে গেল নীপা টের পায়নি। টের পেল সেদিন, যেদিন খবর পেল অংশু ওর পছন্দের কলেজে পছন্দসই স্ট্রিমে চান্স পেয়ে গেছে আর ও পায়নি। তারপর থেকে অংশুরও ওদের বাড়িতে আসা বন্ধ হয়ে যায়। যেদিন প্রথম অংশু এল না, নীপা নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল এই ভেবে যে, হয়ত ও নিজের ভর্তি হওয়ার বিভিন্ন কাজে আটকে পড়েছে। কিন্তু তা আর কতদিন? একদিন শুনতে পেল, অংশু অন্য শহরের বাসিন্দা হয়ে গেছে। তাসের ঘরের মতন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ওর স্বপ্নের জীবন-ইমারত। সেদিন থেকে দোতলা বাড়িটাতে আর হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল মেয়েটার গলার আওয়াজ পাওয়া যেত না।
খুব কেঁদেছিল নীপা। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে। নিজেকে দোষারোপ করে গিয়েছিল ক্রমাগত। মা-বাবা বোঝেননি, ভেবেছিলেন মেয়ে পছন্দের কলেজে চান্স না পাওয়ার জন্য মনমরা। এক- দেড়মাস পর, যখন শোকটা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে, একদিন ফেসবুকে মেসেজ করেছিল অংশুকে। অংশুও ওর স্বভাবমতন ঠাট্টা ইয়ার্কি করে যাচ্ছিল, দুঃখ করছিল ওর সাথে দেখা না করে চলে আসতে হয়েছে বলে। নীপা বেশি কথা বাড়ায়নি আর। শুভরাত্রি উইশ করে অফলাইন হয়ে গিয়েছিল। টের পেয়েছিল, ও যতদূরেই থাক না কেন, অংশুর সংস্পর্শে থাকলেই ও দুর্বল হয়ে যাবে। সেদিনের পর থেকে ও অংশুর সাথে মেসেজিং করাও প্রায় বন্ধ করে দেয়। মাঝে মাঝে অংশু মেসেজ করত ঠিকই, তবে তা নেহাতই কেজো কথাবার্তা। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। তবু নীপা অংশুকে ভুলতে পারেনি কোনওদিন। কারণে অকারণে মনে পড়ত দামাল ছেলেটার কথা।

তারপর কেটে গিয়েছে অনেকগুলো দিন, মাস,বছর। অনেকগুলো বসন্ত কেটে গিয়েছে একলা মেয়েটার। সেদিনকার সেই নীপা আর আজকের নীপার মধ্যে অনেক তফাত। সেদিনের সেই নীপা আজ একাধারে সুগায়িকা, পার্ট-টাইম শিক্ষিকা এবং একটি বহুজাতিক সংস্থাতে কর্মরতা। আজকের নীপা নিজের দোষ জানে, সেটাকে ঢাকতেও জানে। আজকের নীপাও স্বপ্ন দেখে, তবে তৈরি থাকে সেটাকে ভাঙতে দেখার জন্য।
কিন্তু আজ নীপা আর নিজেকে ঢেকে রাখতে পারছে না। শত চেষ্টাতেও। কে জানে কেন, আজ সকাল থেকে ওর মন অস্থির হয়ে উঠেছে। ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় টের পাচ্ছে, খুব বড় একটা ঝড় আসতে চলেছে ওর জীবনে। যা বদলে দেবে ওর জীবনের অভিমুখ।

ছটফট করতে করতে একসময় বেরিয়ে পড়ল ও ঘর থেকে। হাঁটতে থাকল রাস্তার ধার বরাবর। মাঝে মাঝে উষ্ণ দখিনা বাতাস এসে ঝাপটা মেরে যাচ্ছে ওর চোখেমুখে, জ্বালা করে উঠছে ওর চোখদুটো। কোথায় একটা কোকিল একটানা ডেকে চলেছে। রাস্তার বাঁকে একটা পলাশ গাছ, লাল ফুলে ছেয়ে গিয়েছে গাছের নীচটা। পলাশ ফুল দেখলেই ওর অংশুর কথা মনে পড়ে। দোলের দিন সক্কালবেলায় এসে গিয়েছিল ও, এসেই একখানা পলাশের মালা গুঁজে দিয়েছিল ওর খোঁপায়। আজও বোধহয় মালাটা ওর ঘরের কোন বাক্সের কোণে পড়ে আছে। অংশুর দেওয়া কোন জিনিস নীপা ফেলত না।

গলির পলাশ গাছটাকে পিছনে ফেলে কখন যে বড় রাস্তায় চলে এসেছে, চিন্তায় ডুবে থাকা নীপা তা টের পায়নি। হুঁশ হল গায়ে একটা টোকা পড়তে। তাকিয়ে দেখে, একটা বাচ্চা মেয়ে, বড়জোর সাত কি আট বছরের হবে। তার কোলে আরেকটা ছোট্ট বাচ্চা ছেলে, দু-তিন বছরের। ক্ষিদের জ্বালাতেই বোধহয়, তারস্বরে কেঁদে চলেছে। শতচ্ছিন্ন ময়লা পোশাক মেয়েটার গায়ে, আর ছেলেটা প্রায়-উলঙ্গ। মেয়েটার ভাইই হবে হয়ত। হাত বাড়িয়ে টাকা চাইছে। কি মনে হতে ও দোকান থেকে একটা ক্যাডবেরি কিনে দিল মেয়েটার হাতে। দিয়ে তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। মেয়েটা গিয়ে বসল ফুটপাথে।দিয়ে খুব যত্ন সহকারে ক্যাডবেরির মোড়কটা খুলে একটা একটা করে টুকরো খাইয়ে গেল বাচ্চাটাকে। নিজে একটা টুকরোও মুখে দিল না। দেখতে দেখতে কখন ওর নিজের চোখে জল চলে এসেছে ও নিজেও খেয়াল করেনি। বুঝল ও, ভালবাসা মানেই শুধু দু’জন মানুষের মিলনাকাঙ্খা নয়। তার থেকে অনেক বড় কিছু একটা।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ও মেয়েটার দিকে।
-তোর নাম কি রে?
-ছেমি।
-কোথায় থাকিস?
-টুকু দূর আছে বটেক।
-কত দূর? আমায় নিয়ে চ’ তো।
-আসেন আমার সাথে।
সঙ্গে সঙ্গে ওর বাড়িটা অবধি গেল নীপা। একখানা পোড় খাওয়া বস্তির মধ্যে বাড়ি। বাচ্চাটার বাবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত, মা চার বাড়ি কাজ করে। কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় মেয়েটাকে আর ছেলেটাকে একা ছেড়ে দিয়েছে। ও মনে মনে সঙ্কল্প নিল, এই ধরণের পরিবারগুলোর জন্য কিছু করবে। শুধুমাত্র নিজেকে না, অংশুকে না, অন্যকে ভালবাসা তো এভাবেও যায়!

এঁদো বস্তিটার গলিটা থেকে নীপা বেরিয়ে এল বড় রাস্তায়। আচমকা একটা ‘এক্সকিউজ মি’ শুনতে পেয়ে ঘুরে তাকাল। দেখে, কুড়ি-বাইশ বছরের এক ছোকরা তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
-আমায় ডাকলে?
-হ্যাঁ, আপনিই কি মিস নীপা…?
-হ্যাঁ, বাট তুমি কি করে…
-এক বাবু আপনাকে দিতে বললেন এটা।
দিয়ে হাতে কি একটা গুঁজে দিয়ে পালাল। ওর খেয়াল হল,আশেপাশের সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন খুব মজার ব্যাপারের সন্ধান পেয়েছে একটা।হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে, একখানা চিঠি। রেঁস্তোরায় দেওয়া ন্যাপকিনের ওপর লেখা। হাতের লেখাটার দিকে চোখ পড়তেই পাথর হয়ে গেল ও। অংশুর হস্তাক্ষর। তাছাড়া ওটা আর কারও লেখা হতেই পারে না। লোকের কৌতূহলী চোখ এড়াতে ও একটা ছাউনির নীচে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করল চিঠিটা।
প্রিয় নীপা,
জানি তুই আমার ওপর খুব রেগে আছিস না বলে চলে গিয়েছিলাম বলে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমার হাতে একটুও সময় ছিল না। মনে আছে, তোর সেই লোককে হেল্প করার বাতিক দেখে তোকে বিশ্বহিতৈষিণী বলে ক্ষ্যাপাতাম? সত্যি বলছি, তখন বুঝিনি ওটা কত দরকারি আমার অদরকারি কাজের ঠেলায়। আজ বুঝেছি। আর তাই কাজ ফেলে দৌড়ে  এসেছি এতদূর। এসে দেখলাম তুই বাচ্চাটার সাথে ঢুকছিস গলিটাতে। জানি কি ভাবছিলি তুই। সত্যি বলতে কি জানিস, আমারও খুব ইচ্ছা করে ওদের জন্যে কিছু করতে। নিজে এসে তোকে বলতে পারলাম না কথাগুলো, এতটাই অপরাধী লাগছে নিজেকে। তাই বলছিলাম, যদি আমায় ক্ষমা করতে পারিস, আর এই অংশুকে তোর কাজের অংশীদার হিসেবে নিতে পারিস, তাহলে রাস্তার উলটোদিকের কেএফসিটায় চলে আয়।
অপেক্ষায় রইলাম।
ইতি,
তোর অংশু।
চিঠিটা পড়তে কয়েক মুহূর্ত লাগল নীপার। হঠাৎ একটা নিমপাতা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এসে পড়ল চিঠিটার ওপর। আর ওটার সাথেই যেন ঝেড়ে ফেলল নিজেকে নীপা। ওর সব রাগ, অভিমান, অনুতাপ ঝেড়ে ফেলল। ও বুঝে গেছে, অংশুকে ওর দরকার। নিজের জন্যে নয়, ওর কাজের জন্য। তাই আর সময় নষ্ট না করে রাস্তা পার করার কন্য পা বাড়াল নীপা। কি জানি, ওর স্বপ্নের ঘরের ভিতটাও হয়ত এই ফাঁকে তৈরি হয়ে যেতে পারে!

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s