বসন্তের ডায়েরি

আচ্ছা, বসন্তের কেমন একটা আলাদা মেজাজ থাকে না? মন ভালো করা ফুরফুরে দখিনা বাতাস, তাতে বকুল-জুঁই-টগরের মিষ্টি গন্ধ মেশানো। দুপুরে সজনেফুলের বড়া, থোরের তরকারি, কলাইয়ের ডাল দিয়ে গরম ভাত। ঘটরঘটর ফ্যানের আওয়াজের সাথে গায়ে পাতলা চাদর জড়িয়ে নরম বালিশ-পাশবালিশের সাথে সুখনিদ্রায় ডুব।
বাইরে দুপুর রোদ চুপচাপ। কাঠবিড়ালিগুলো পাতায় ডালে খরমর খরমর শব্দ তুলে লাফিয়ে বেড়াতে থাকে।আলোর বিন্দুগুলো চকচকে নতুন সবুজ- লাল পাতাগুলোর গা থেকে গড়িয়ে পড়ে মাটিতে, গড়াতেই থাকে। বেলা গড়িয়ে যায়।
আর একটু বেলা পড়ে এলে ভাঁটফুলের সুগন্ধ, পায়ের নিচে মচমচ করে গুঁড়ো হতে থাকা শুকনো পাতার গন্ধ এসে পৌঁছোয় নাকে। সবুজ ঘাসে ভরা মাঠ, তার এখানে ওখানে খাবলা খাবলা করে ঘাস উঠে গেছে। সবুজসাগরে মাটির দ্বীপের মতন। ওইটুকুতেই কাঠের তক্তা পুঁতে ক্রিকেট খেলা। কখনও-সখনও ফুটবলও চলে। চারটে হলেই মাঠের দিকে দাও দৌড়। ছোট্ ছোট্, সব চলে এল বলে। মাঝে সাঝে পাশের বাড়ি বল চলে যাওয়া, আর তারপর রক-পেপার-সিজার্স দিয়ে বের করা কার পালা বল উদ্ধার করার।
ওঃ হোঃ, আরেকটা তো বলাই হয়নি। কোকিলের ডাক? বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। সব্বাই জানে, কিন্তু তাও বলতে ইচ্ছে করে কেন, কি জানি! ওই ভর-দুক্কুরবেলা, ভূতের ঢেলা মারার জায়গায় দূর থেকে আসে ভেসে- কুউউ,কুউউ। শুনলে যে কি হয় কি করে বোঝাই! মাঝে মাঝে দুষ্টুবুদ্ধি চাপে মাথায়, তখন কোকিলের ডাক নকল করা। দিয়ে মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে তাতে তখনকার মতন ইতি।
তো সে যাক। যা বলছিলাম। সারা বিকেল খেলে টেলে ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে ঘরে ফেরা রাস্তার আলো জ্বললে। তারপর একপ্রস্থ চান করে টরে একগ্লাস দুধ খেয়ে লক্ষীছেলের মতন পড়তে বসা। ওদিকে বাইরের ঘরে তখন টিভিতে গোয়েন্দা গিন্নি। বাইরে তখন শনশন দখিন হাওয়ায় গাছ ঝমঝম করে ওঠে। ক্লান্ত বিজন সন্ধ্যাবেলায় ফুল ফোটানোর খেলা খেলতে হয় কিনা? রবিঠাকুর তো সেই কবেই লিখে গেছেন। গাছ মেনে চলে। চলতে হয়। নয়তো সময়ের মাঝে অস্তিত্ব রাখবে কিভাবে?
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলে। কারোর তোয়াক্কা না করে। ক্রমে টিভি সিরিয়ালদের সময় শেষ হয়, হেঁসেল থেকে ছ্যাঁকছোঁক শব্দ আসতে থাকে। রাত্তিরবেলা পান্তাভাত, পেয়াজ, নুন, পেঁয়াজি বা বড়া। বা হয়তো ফ্যানভাত, আলুসেদ্ধ, ডিমসেদ্ধ, কাঁচালঙ্কা। খেয়েদেয়ে ব্যালকনি। রজনীগন্ধার গুচ্ছ ফুটে থাকে। বনে বনে তখন চাঁদের আলো লুকোচুরি খেলে পাতাদের সাথে।

আরেকটু রাত বাড়লে দুনিয়া খোলে অন্তর্জালের। তখন কত হাসি, কত কথা, কত স্মৃতিচারণ। লজ্জা লজ্জা ভাবে, দুরুদুরু বুকে কেউ অপেক্ষা করে তার জীবন-বসন্তের, আবার কেউ কেউ হয়ত পালন করে রোদন ভরা এ বসন্ত। হাসি-ঠাট্টা-ইয়ার্কির মধ্যে দিয়েই গড়াতে থাকে রাত। কালপুরুষ, অঙ্গীরা, লুব্ধকদের অবস্থান পাল্টে পাল্টে যায়। শ্যাঁসশ্যাঁস করতে করতে হয়ত একটা প্যাঁচা মনখারাপ করে উড়ে বেড়াতে থাকে একা একা। চৌকিদার এসে হাঁক দিয়ে যায়। তার হাতে লণ্ঠনে টিমটিমে আলো। অন্ধকারকে নিস্তেজ করে ফেলে।
ক্রমে দিগন্তে আভাস জাগে আলোর। মাছওয়ালারা চলে তাদের ড্রাম নিয়ে, ভালো মাছের দরটা আগে দখল করা দরকার। মিনিবাসের ড্রাইভারটা পুজো করে হনুমান ঠাকুরের ছবিটায় ধূপ জ্বালে। স্ট্যান্ডে আসার রাস্তায় একজায়গায় দাঁড় করিয়ে পাঁচটাকার একখানা ফুলের মালা কিনে পরানো হয়। ক্লাস ফাইভের ছেলেটা উঠে পড়ে সকাল সকাল একটু পড়ে নেবে বলে। কলেজে পড়া রোহন জগিং করতে বেরিয়ে পড়ে, আজ তার বাড়ির সামনে দিয়ে সে যাবে কিনা। জিমে যাওয়ার পথে ওয়ার্ম-আপটাও হবে। বাড়ির কর্তা খবরের কাগজখানা নিয়ে এসে বসেন ব্যালকনিতে। তাঁর পায়ের কাছে নরম রোদ এসে লুটোপুটি খায়। দুধওয়ালা এসে দুধ দিয়ে যায়। আজ একটু বেশি করে, পায়েস মিষ্টি তৈরি হবে কিনা।

ঘড়ির কাঁটা পৌঁছে যায় সাতটাতে। টিভি চালু করেন গিন্নি। তখন সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রভাতফেরি এগোয় তালে তালে, “ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল…”।
কালো আকাশ নীল হয়, নীল আকাশ গোলাপি। আজ দোল।

 

Advertisements

2 thoughts on “বসন্তের ডায়েরি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s