মেঘডম্বরম্

বর্ষাকে আমার ভারি ভাল লাগে। না তা বলতে আবার ভেবে বসবেন না যেন নির্ঘাত ছেলেটা বর্ষা নামক জনৈক ললনার ব্যর্থ প্রেমিক, লেঙ্গি খেয়ে ফিলিংস উজাড় করতে বসছে। ওই “আমার ছোনা” “আমার বাবু” ইত্যাদি গোছের নেকুপুষুমুনু সংলাপ আমার দু’চক্ষের বিষ। বাপু হে, ভগমান মানুষ করে জন্ম দিয়েছেন তা একটু মানুষের মতন কথা বল না, অতো ঢং করে সং সাজার কি আছে!
যাই হোক। বর্তমান-অতীত-ভবিষ্যৎ বা ভূতপূর্ব-অভূতপূর্ব প্রেমিক-প্রেমিকাদের আদিখ্যেতার ছেরাদ্দ করতে এ রচনার অবতারণা নয়। মোদ্দা কথা, বর্ষাকে আমার ভারি ভালো লাগে। বঙ্গসন্তান-সন্ততিরা বুঝবেন ইহার আলাদা আমেজটা কোথায়। একদম স্বতন্ত্র। সান্ধ্যকালে চাট্টি মুড়ি-সরিষার তৈল সমেত মুচমুচে করে ভাজা পকোড়া কি সিঙ্গারা, নিদেনপক্ষে চপ যে না উপভোগ করেছেন, তাঁহার এ জনম বৃথা কাটিল হায়।
এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। আপনি এই অধমকেই দেখুন না। সাত সমুদ্র তেরো নদী পার তেপান্তরের রাজ্য সম একখানা জায়গায় কলেজ। তা সে কলেজ তো কলেজ, তার দোষ নেই। দোষ এই হতভাগা বাঙালিয়ানার। যে ছেলে মায়ের আঁচলের তলায় চিরটাকাল পেটপুরে খেয়ে নাদুসনুদুস ভুঁড়ি বাগিয়ে দিবানিদ্রা দিতে অভ্যস্ত, তার পক্ষে ওইখানে গিয়ে ছ’-ছ’টা মাস কোনওক্রমে মুড়ি-চিঁড়ে খেয়ে বাঁচা সম্ভব? আপনিই বলুন?
সেও না হয় হল। দুবেলা এটা-ওটা-সেটা খেয়ে কোনরকমে উদরপূর্তি তো করা গেল। রসনাকে পরিতৃপ্ত করার কথা ভেবে লাভ নেই, হবার মধ্যে কেবল মনটি দেবে ডিপ্রেশন সাগরে ডুব। ডুব তো ডুব এক্কেরে রামডুব। পূর্বজন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আর কি!
এধরণের খাঁটি বাঙালি ছেলেকে এখন যদি আপনি একহাতে রুমাল একহাতে চশমা ধরিয়ে দিয়ে বলেন, “বাপু হে, সামনে তোমার পরীক্ষা, মন দিয়ে পড়ো গিয়ে যাও”, স্বাভাবিকভাবেই নামের আগে একটা চন্দ্রবিন্দু অযাচিতভাবে এসে নিজের দখল জারি করতেই পারে। হুঁ হুঁ বাওয়া, ফেবুতে এত্ত এত্ত ফ্রাস্ট্রু খাওয়া ইন্জ্ঞিনীয়ারের দল এমনি এমনি বেড়ে চলেছে?
পরীক্ষা তো কোনরকমে দেওয়া হল না হয়। এর থেকে টুকে ওর থেকে জিজ্ঞেস করে পাশ মার্কসটুকু বগলদাবা করে পাড়ি দিলুম বাড়ির উদ্দেশ্যে। আহা, নম নম নম সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি। যতবার ট্রেনে করে ফিরি ততবার এই লাইনটায় মাথায় আসে বারবার। তো এহেন অকথ্য মানসিক (এবং শারীরিক) বিপর্যয়ের পর বাড়ি এসে বাঙালির ছেলে ভাত ডাল খেয়ে কোলবালিশ বাগিয়ে টেনে ঘুম লাগাবে, সেটাই বাঞ্ছনীয়, নয় কি?
এবার এটা ভাবুন। আপনি পরীক্ষা দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসছেন। আসার পর দিবারাত্রি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গতরখানা যথারীতি আগের মতন গড়ে তুলেছেন যত্ন সহকারে। বেশ, যার শেষ ভাল তার সব ভাল। নাকি উল্টোটা? মরুক গে যাক। ভাবুন, আপনি এসছেন এমন জায়গা থেকে, যেখানে একদিনও বৃষ্টি ছুটি নেয় না। আর বাড়ি ফিরে আসা ইস্তক বস্তাপচা গরমে প্রাণ আইঢাই, পাখি খাঁচা ছেড়ে যখন-তখন উড়ে পালাতে পারে। এমন সময় এসে পড়ল বর্ষা। এক্কেবারে ভৈরব হরষে নবযৌবনা রূপে। আপনি সেদিন সক্কাল সক্কাল উঠেছেন, মেজাজ আছে খিঁচড়ে। কেন? না আপনি গতকাল রাত তিনটে অবধি সিনেমা দেখেছেন, দ্য ফ্যল্ট ইন আওয়ার স্টারস। তারপর দিন কোথায় দশটা অবধি মিষ্টি মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমোবেন, তা না, সকাল সাতটায় ঘুম ভেঙে গেছে। দায়ী বঙ্গজননীদের ওই চিরন্তন পদ্ধতি যা বাঙালির ঘুম ভাঙাতে সবসময় সক্ষম। সাক্সেস রেট হান্ড্রেড পারসেন্ট। দিব্যি খোশমেজাজে হাত পা খানি ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছেন, হঠাৎ ফ্যানের পাখা ঘোরা স্থগিত হয়ে গেল। কারেন্ট গেল নাকি? না, মাতৃদেবী ঘুম থেকে উঠিয়ে বাজারে পাঠানোর জন্যে ফ্যানের সুইচটি দিয়েছেন বন্ধ করে। আপনি হাত বাড়িয়ে চালাবেন তারও উপায় নেই, খাট থেকে নামতেই হবে।
অগত্যা বেজার মুখে খাটে বসে বসে চোখ রগড়াচ্ছেন আর তারই সাথে সাথে ঢুলছেন, এমন সময় জানলাটা দিয়ে এক ঝলক তাজা ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকে আপনাকে কাঁপিয়ে দিল। কিরকম লাগবে? আপনি খানিকটা অবাক হলেন। অন্যদিন তো সকাল সাতটাতেই লোকে হাঁসফাঁস করে, আজকে এত্ত ঠান্ডা? ব্যাপার কি? ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন, আপনার জানলা দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছে, তা ঘননীল মেঘে ঢাকা। আপনার জানলা দিয়ে যে শালগাছটা দেখা যায়, সেটার পাতাগুলো কেমন তিরতির করে কাঁপছে। আপনি দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, আজ পয়লা আষাঢ়। মানে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আজ থেকে বর্ষাঋতু শুরু হল। আপনি ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসে দেখলেন, দূরে যেখানে সামনের খেলার মাঠটা দিগন্তে মিশেছে, ওখান থেকে উঠে আসছে একটা মেঘ। একদম মেডিটেরেনিয়ান ব্লু রঙের। ওয়াটার কালার করার সময় যেরকম রং দিতেন মেঘের, অবিকল সেই রঙের। আকাশটার এদিক ওদিক থেকে মাঝে মাঝে গুরগুর গুরগুড় আওয়াজ আসছে। মনটা ভালো হবে না?
পাছে দেরি হলে আবার একপ্রস্থ বকুনি শুনতে হয় (হায় রে পোড়াকপালে বাঙালি! যতই যুদ্ধজয় করুক, মায়ের বকুনির সামনে সব বাঙালি কেঁচো, আপনারাও জানেন) আপনি চুপচাপ চা-টা খেয়ে গায়ে একখানা গেন্জ্ঞি চাপিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন বাজারের উদ্দেশ্যে। মোরাম রাঙা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে (হ্যাঁ মোরামের রাস্তা,ঠিকই পড়লেন) যখন দেখেন গাছগুলোর এডাল থেকে ওডালে টিয়াপাখিগুলো ট্যাঁও ট্যাঁও আওয়াজ করতে করতে উড়ে বেড়াচ্ছে, মনে আহ্লাদ আসবে না? যতই হোক, বাঙালি বলে কথা। রোমান্টিসিজম বাই ডিফল্ট ইনবিল্ট। আপনি মনে মনে গুনগুন করে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ গাইতে গাইতে বাজার সেরে ফিরে তো এলেন। তা তারপর যখন মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামল শেষমেষ, বচ্ছরকার প্রথম বৃষ্টি, তাতে একটু ভিজতে মন চাইলে আপনার দোষ? কিন্তু ওই, মা জননীকে বোঝাও! যতই বলো যতই লাফাও, উনি ওনার সেই অকাট্য যুক্তি থেকে নড়বেন না। “না এই বৃষ্টিতে ভিজে কাজ নেই, আবার ঠান্ডা লাগিয়ে জ্বরে পড়বি।” আপনার কোন যুক্তি কোন তর্ক ধোপে টিকবে না।
অগত্যা আপনি কি করেন? মোবাইল ল্যাপটপ ইত্যাদি যাবতীয় গ্যাজেট খুলে বসে কাজ শুরু করার কথা ভাবলেন। সবেমাত্তর সেকেন্ড সেম দিয়ে ঘরে এয়েচে, তার আবার কাজ! হুঁহ! ছোঁড়ার এদিক নেই ওদিক আছে! তা বলি আর কি করা বাবুমোশায়? কাজ আছে আপনাদের। আমাদের তো সারাটা বচ্ছরই পড়াই থাকে, দুদিন এট্টু জিরোলেও দোষ? বলি আপনারাও তো সিএল নেন নাকি? আমাদের কাজ তো না, ফেবু ঘাঁটা, ফিলিং রেন উইথ এন্জ্ঞেল প্রিয়া অ্যান্ড ৬১ আদার্স গোছের আদেখলাপনা স্ট্যাটাসে লাইক ঠুকে মন্তব্য করা, আর তার সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে হরর কি ডিটেকটিভ সিনেমা ডাউনলোডে বসিয়ে অরিজিৎ সিং রোম্যান্টিক প্লেলিস্টটা চালিয়ে দেওয়া। এর পর যখন মায়ের হাতের গরম গরম পরোটা আর আলুর তরকারি আসে, আহা, কি কম্বিনেশন! আপনি পেটে পরোটা ঠুসতে ঠুসতে তখন মনে করবেন সেই দিনগুলির কথা, যখন আপনাকে পিঠে এই ইয়াব্বড় একখানা ব্যাগ আর সারাগায়ে ওভারসাইজড ঢাউস একখানা বর্ষাতি চাপিয়ে স্কুলে বা টিউশনে যেতে হত রাস্তা-নদী পার করে। সে কি জলের তোড়, বাব্বাঃ! যেন বাঁধের ছাড়া জল আর কোন রাস্তা না পেয়ে খোদ আপনার পড়তে যাওয়ার রাস্তা দিয়েই পাঁইপাঁই ছুটেছে! জল চলে রাস্তায় রাস্তায়, আপনি চলেন সাইকেলের প্যাডেলের প্রেশারে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যত জোরে সম্ভব জলের স্রোত কেটে বেরোনো, রাস্তার ধারে সযত্নে শাড়ির পাড় কিংবা সালোয়ার-কামিজ বাঁচিয়ে চলা জনৈক বঙ্গললনার গায়ে জল ছিটিয়ে দিয়ে তাঁর জ্বলন্ত দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে পগার পার, মনে পড়ে? সেইসব ছিল বাঁচার দিন। কিন্তু আফসোসটা কোথায় হয় জানেন? এই সত্যিটা তখন জানতুম না। কাজগুলি করেছি ঠিকই, কিন্তু কাজটার আনন্দটুকু উপভোগ করার থেকে টিউশন কি স্কুলে পৌঁছানোর তাড়াটাই মুখ্য ছিল তখন, আর বাকি সব ছিল গৌণ। আজকাল ফেবু খুললেই গুচ্ছের নিউজফিড আসে, ইউ শ্যুড লিভ ইওর লাইফ, হ্যানাত্যানা এমন কত কি। আসলে কি জানেনন? এত আড়ম্বরের মাঝে আনন্দকে খুঁজতে গিয়েই আমরা সহজ সত্যিটা বিস্মৃত হয়ে যাই। যে বেঁচে থাকার রসদ আমাদের চারপাশেই আছে। কিন্তু এই ডিজিটাল ইঁদুরদৌড়ের যুগে তাও হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, আমরাই শুধু দেখতে পাচ্ছি না।
তাই বলছিলাম কি, চলুন না একটা দিন সবাই নিজেদের জন্যে রাখি? একদম খাঁটি বিশুদ্ধ বাঙালি মতে বর্ষাকে পালন করি? সকালে গরম চা সহযোগে প্রাতরাশের পর কোন নভেল, দুপুরে সনাতন খিচুড়ি-বেগুনি-ইলিশ খেয়ে ঘুম(অবশ্যই কোলবালিশ সাথে), সন্ধ্যেবেলায় সেই মোড়ের মাথার তেলেভাজা…
কে জানে, হয়তো একদিন দেখব সবাই, মরিশাসের ডোডো পাখির মতন বর্ষার আমেজটুকুও বিলুপ্ত হয়ে গেছে ঝাপসা কাঁচের ওপারে।
বর্ষাকে যে আমরা সবাই খুব ভালোবাসি।

Write up ©Arjo Dasgupta
If you like this post, please do not forget to like it and share it with your family and friends!

 

Advertisements

2 thoughts on “মেঘডম্বরম্

  1. সেদিন এখানে বেশ ঝেঁপে বৃষ্টি হল, অনেকটা তোমার লেখা বর্ষাকালের বৃষ্টির মতন। তখন মনে পড়ছিল দেশের কথা, আর এই তোমার লেখায় আবার হারিয়ে গেলাম ছোটবেলায় স্কুল-কলেজের বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া দিনগুলোর কথা স্মরণ করে।

    Liked by 1 person

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s