স্টেটাস

বিকেলের দিকে একপশলা বৃষ্টি হওয়ার পরে যে নরম আলোটা থাকে সেটা ভারী ভালো লাগে আমার। কেমন একটা মনখারাপ করা আবেশ মিশে থাকে তাতে। এই যেমন এখন। সকাল থেকে চরাচর ভাসিয়ে দিল বৃষ্টিতে, অথচ বিকেল পড়তেই কেমন মোলায়েম আলোয় মেখে গেল আকাশটা। মনখারাপ এর অনেকের অনেক রকম কারণ থাকতে পারে। তবে আমার কারণটা একটু অন্যরকম।

আমার মন খারাপ কারণ আমি হেরে গেছি। লড়াই করতে চেয়েছিলাম প্রাণপণে, কিন্তু পারিনি। নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল, ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। আমার মাঝে মাঝে কেন জানি না মনে হয় যে আমাদের প্রজন্মের জন্য প্রত্যেকটা পরীক্ষাই অগ্নিপরীক্ষা। সেটার জন্যে ধরাবাঁধা প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় একদম মাধ্যমিক থেকে। স্বপ্ন দেখানো হয়, লোভ দেখানো হয়। মনের অনুভূতি গুলো কে সযত্নে বেঁধে ফেলা হয় ক্যারিয়ারের দড়িতে। আর স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমরাও কখন যে বাঁধা গতের ক্রীতদাস হয়ে উঠি, আমরা নিজেরাও বোধহয় খেয়াল করতে পারি না।

আমার মনখারাপ কারণ আমার দেশ মারা গেছে। ধর্মের নামে, নাকি সীমারেখার নামে, আমি জানি না। শুধু জানি আমার দেশ মারা গেছে। কালকে। যখন রাস্তাঘাটে বাড়িতে বাড়িতে প্রত্যেকটা মানুষের মুখে একটা কথাই শুনতে পেয়েছি। পাকিস্তান কে উড়িয়ে দেওয়া হোক। তেজস্ক্রিয় পরমাণু বোমার প্রত্যেক টুকরো মৃত্যু মিছিল তৈরী করুক শহর জুড়ে। রাস্তায় বাড়ির উঠোনে সর্বত্র রক্তস্রোত বইতে থাকুক। ঈদ এর দিনে কুরবানি হওয়া খাসির রক্ত যেমন বান ডেকেছিল বাংলাদেশের রাস্তা জুড়ে, ঠিক তেমনভাবেই মানুষে মানুষের রক্তের প্লাবন বইয়ে দিক অন্য এক প্রতিবেশীর দোরগোড়ায়। দেবে নাই বা কেন? যে দেশে পাশের বাড়ির ছেলে একটু রেজাল্ট ভালো করলে এই বাড়ির চোখ টাটায়, যে দেশে প্রত্যেক বছর চুলচেরা প্রতিযোগিতায় নামে লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে ক্যারিয়ার গড়ার নামে, যে দেশ অন্যায্য দামে সিনেমা হলে পপকর্ণ কিনে, ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পড়ে, দামী মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্টেটাস দেখাতে অভ্যস্ত, সেই দেশের ওপর হামলা করলে তো দেশ ছেড়ে কথা বলবে না! তাকেও তো নিজের স্টেটাস দেখাতে হবে। তারও দেখানো দরকার, পৃথ্বী-ধ্বংসকারী অস্ত্র তার কাছেও অঢেল পরিমানে মজুত। প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে সে এতটুকু কার্পণ্য করবে না।

কয়েকদিন আগে মোকাম্বো নিয়ে হইচই হলো না? এক দাদার লেখায় পড়েছিলাম –  মোকাম্বো আমাদের আসল রূপটা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। ঠিকই তো। আমরাই তো ভেদাভেদ সৃষ্টি করেছিলাম, বিস্মৃত হলে চলবে কেন? আমরা যে প্রতিদিন স্টেশনে বসে থাকা ভিখিরিগুলোকে এড়িয়ে যাই বাচ্চা-বুড়োর তোয়াক্কা না করে, ট্রেনে নারী-পুরুষ ছাড়া অন্য কেউ উঠলে ঘুমোনোর ভান করি, আবার সেই আমরাই যখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছে নিজস্বী তুলে দুনিয়াকে জানাতে উদগ্রীব হয়ে পড়ি, তখন বেশ একটা আত্মতুষ্টি বোধ করি। ‘নাঃ, আমার একটা স্টেটাস আছে’ – এই কথা বলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়াই। অস্বীকার করতে পারবেন কতজন?

আসলে কি জানেন তো, এই স্টেটাসই হলো আসল জিনিস। মোকাম্বোর উত্তর, তার প্রত্যুত্তরে তার রেটিং কমিয়ে দেখানো, বিশ্বাসের গ্রেফতার হওয়া, পাকিস্তানের উগ্রবাদী হামলা, তার জবাবে প্রত্যেক মানুষের এই যে পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছে – এই সবকিছুই একটা সুতোয় বাঁধা। এতদিনে মুখোশটা খুলছে, পরতের পর পরত। এই তো আমার আসল দেশ, এই তো আমার ভারতবর্ষ। এই দেশই একদিন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গর্জে উঠেছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে, সৌহার্দ্য স্থাপন করেছিল একে অন্যের সঙ্গে, ভাবতেও কেমন লাগে!

তার থেকে বরং আমাদের এই ভালো। এভাবেই একটার পর একটা হামলা হোক, আর আমরা সেই দুঃসাহসী দেশকে গুঁড়িয়ে দিতে সেনাবাহিনীদের পাঠাই।

তাতে আসুক না আরেকটা হিরোশিমা, ক্ষতি কোথায়!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s