তোমার পথের থেকে …

 কাল মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের শুরু। ট্রেনটা যখন ঢুকলো প্ল্যাটফর্মে, তখনও আমার মনে পুজো পুজো ভাবটা আসেনি। আসলে শরতে অন্যরা কাশফুলের আন্দোলন, শিউলির সুঘ্রাণ ইত্যাদি নিয়ে ন্যাকা ন্যাকা স্টেটাস দিয়ে “শরত তো এসে গেছে” টাইপ আদেখলামো করতে পারলেও আমি সেটা পারি না। ফুলে আমার বরাব্বরের আল্যার্জি, কারণটা বোধহয় তাই। আমার শরত অন্যভাবে আসে।

আগে বরং নিজের ব্যাপারে একটু বলি। আমি রথীজিৎ। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। আমি নিশ্চিত, আমার বিষয়ে আর বিশদে বলার দরকার নেই। আর পাঁচটা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার যেমন হয়, ঠিক তেমনই আমি। কাটখোট্টা জীবন, রোজ রোজ সেই একই অফিসে বসের ধ্যাতানো শুনতে শুনতে মনে মনে নিজের ভাগ্যকে গালমন্দ করা আর বিকেলবেলায় ওভারটাইম খেটে ঘরে গিয়ে খাতায় হিজিবিজি আঁকা আর হাবিজাবি লেখা। দুটোই শখে করা। কোন কলিগ জানে না। জানলে অবিশ্যি আমি খিল্লির পাত্র হয়ে যেতাম। যেচে হাঁড়িকাঠে মাথা দিতে কেই বা চায়! যে জায়গাটায় বসি, এতটুকু রোদ আসে না জানেন? টেবিলে একটা ফুলের গাছ লাগাব ভেবেছিলাম। ছোট্ট টবে একটুখানি তাজা সবুজ। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে গেলে যাতে একটু দু’দন্ড বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই। তবে শীততাপনিয়ন্ত্রত অফিসঘরে তা হবার জো আছে?

যাক গে। যা বলছিলাম। কি যেন? ও হ্যাঁ, আমার শরত। আপনারা হয়ত ভাববেন, শরতের আবার অন্যরকম আসা কি? আকাশের নীলরঙা বালিশে সাদা তুলোর মতন মেঘ, সোনা রঙের রোদ, রাত্রে আলতো শীতের আভাস শিশিরপাতের দরুণ, তাকেই তো শরত বলে। ঠিক? ভুল। আমার শরতের শুরু প্রত্যেকবার হয় যখন আমি আমাদের বাড়ির গলিটার মোড়ে ঢোকার সময় রামলখিয়াকে ওর আর ওর মেয়ের পুজোর জামাটা ওর হাতে তুলে দিই। সারাবছর ভারী কষ্ট ওদের। আমি নাহয় দূরে থাকি বলে কিছু করে উঠতে পারি না, পাড়ার লোক তো আরও এককাঠি সরেস। ওকে দিয়ে কাঁহা কাঁহা মুল্লুকে রিকশা টানিয়ে নিয়ে গিয়ে দশ-বিশ টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। বাচ্চাটার মা নেই। মদ্যপ রামলখিয়ার অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে গলায় দড়ি দিয়েছিল সে। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওদের বাড়িতে কড়িকাঠটা বেশ শক্তপোক্তই। মিনতির কোন অসুবিধাই হয়নি। তখন আমার সেকেন্ড ইয়ার। সদ্য দাদা হয়েছি পাড়ার, দায়িত্ব নিয়ে গিয়েছিলাম খবরটা পেয়ে। অনেক বুঝিয়েছিলাম ওকে। বলেছিলাম, “মিনতির জন্যে না হোক, অন্তত বাচ্চা মেয়েটার জন্যে তো এসব ছেড়ে দাও।” আমার বলার গুনেই হোক কি বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখ দেখেই হোক, তার পরের থেকেই রামলখিয়া নেশা করা ছেড়ে দেয়। পুজোতে সেবারই ওদের বাপ-বেটিকে চাঁদা করে জামা কিনে দেওয়া হয়েছিল পাড়ার তরফ থেকে। যতদূর জানি, ওই একবারই। তার পরের বছর থেকে আর কেউ না মনে রাখলেও আমি মনে রাখতাম। নিজের পকেটমানি বাঁচিয়ে হলেও ওদের জন্যে কিনে দিতাম দুটো জামা। আর আস্তে আস্তে কখন যে আমার পুজোর সংজ্ঞা আর ওদেরকে এই ভালোবেসে জামা দেওয়াটা একাত্ম হয়ে গিয়েছিল, আমি নিজেও টের পাইনি।

আমার শরত আমাদের লনের ঘাস কাটার গন্ধ থেকে আসে। অনেকে পাগলের প্রলাপ বলবেন, জানি। কিন্তু কি করি বলুন? শুরুতেই তো বলেছি, আমার শরত মনের অন্য গলি দিয়ে আসে। কিন্তু আমি তো জানি, ওই গন্ধটা আসা মানেই আমরা কাল-পরশু করে রওনা দেব আমাদের দেশের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বহুদিনের অযত্নে আগাছা যাতে গজিয়ে লনটাকে শেষ না করে দেয়, তাই এই আগাম সতর্কতা। সত্যি বলতে গেলে আমি নিজেও জানতাম না আমার দেশের বাড়িও আছে। গেল বছরের আগের বছর মা নিয়ে গেছিল। তার পরের বার থেকে মা-বাবা আর না গেলেও আমি যাই। প্রত্যেকবার নিয়ম করে যাই কেন, তার একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে।

কারণটা আর বলার দরকার আছে কি? বলা নেই কওয়া নেই, একজন ব্যাচেলর কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার কেন প্রত্যেক বছর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ ছেড়ে অজ পাড়াগাঁয়ের দেশের বাড়িতে নিদেনপক্ষে একদিনের জন্যেও যায় কেন, বুদ্ধিমান পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয়ই তা আন্দাজ করতে পেরে গেছেন। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। তার নামটা জানি না যদিও বা এখনও, তবে কল্পনাতে তো অনেক কিছুই হয়, তাই না?

মেয়েটাকে আমি প্রথম দেখি গতবছর। এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল দালানের। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, আমাদের পুজোই আমাদের দেশগ্রামের সবথেকে বড় পুজো। আমাদের ঠাকুর ভোগ না পেলে, আমাদের ঠাকুরের আরতি না হলে, এমনকি আমাদের ঠাকুরের পুজোয় পুরোহিত না বসলে আর কোন পুজোতে কোন পুরোহিত বসে না। বিরাট জায়গা জুড়ে আমাদের ঠাকুরদালান। সাধারণ বাড়ির দু-তিনটে উঠোন একত্র করলে আমাদের ঠাকুরদালানের একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে। তারই এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা। অষ্টমীর দিন দেখেছিলাম প্রথমে। লাল-সাদা সালোয়ার কামিজের কম্বিনেশন কেমন একটা অদ্ভুত লালিমা এনে দিয়েছিল। নাম জানতে পারিনি, যদিও চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। আড়চোখে দেখেই গেছি শুধু। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাকে যেন খুঁজত। সন্ধানী দৃষ্টি মেলে চাইত এদিক ওদিক। রবীন্দ্রনাথের সেই ক্ষুধিত পাষাণের মতন অবস্থা হয়েছিল আমার। গোটা গ্রাম পায়ে হেঁটে চক্কর মেরেছি খুঁজে বের করতে পারার আশায়। কিন্তু পারিনি। পুজোর সময় ঠাকুরদালানে, কিন্তু সব পুজোর পর্ব মিটে গেলেই যেন হাওয়ায় উবে যেত বেমালুম। ঠাকুমাও চিনতে পারেনি, বলেছে “দেখ আত্মীয়স্বজনের কোন সম্পর্কের কেউ কিনা।” কিন্তু তাও নয়। আমাদের কেউ নয়, নিশ্চিত জানতাম।

এবারে আমি মহালয়ার দিনই চলে যাব ওখানে। তাই অফিসেও ছুটি নিয়েছি আগেভাগে। সে কি সহজে মেলে? রাত দিন উদয়াস্ত খেটে বসের হাতে পায়ে কিলোখানেক তেল মালিশ করে তবে ছুটি মঞ্জুর করাতে পেরেছি। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম, এবারে গলির মোড়েটায় রামলখিয়া বা ওর মেয়ে, কেউই নেই। অবাক হলাম একটু। তারপর মনে হল, হয়ত ওরা ভেবে নিয়েছে আমি ষষ্ঠীর দিন ফিরব, যেমনটা হয় প্রত্যেকবার। যাক গে যাক, পরে একসময় মনে করে দিয়ে আসলেই হবে।

মহালয়ার আগের দিন সকাল সকাল স্নান সেরে রওনা দিলাম দেশগ্রামের উদ্দেশ্যে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে –
মধুপ গুঞ্জরিল,
মধুর বেদনায়,
আলোকপিয়াসে অশোক মুঞ্জরিল…

গতবার স্টেটস এ কেনা আফটারশেভটা লাগিয়ে বেরিয়েছিলাম। গন্ধে এখনও গাড়ির ভেতরটা ম-ম করছে। প্রায় সম্পূর্ণ রাস্তা চলে এসেছি, এমন সময়ে হঠাৎ দেখলাম রাস্তার ধারে ও দাঁড়িয়ে আছে। একটা হাত সামনের দিকে প্রসারিত, যেন লিফ্ট চাইছে। নিজের অজান্তে যে কখন ব্রেক টিপেছি, কখনই বা ও উঠে গেছে খেয়াল করিনি। খেয়াল হল গাড়ির দরজা বন্ধ করার আওয়াজে। চারচাকা বিশিষ্টআজ মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের শুরু। ট্রেনটা যখন ঢুকলো প্ল্যাটফর্মে, তখনও আমার মনে পুজো পুজো ভাবটা আসেনি। আসলে শরতে অন্যরা কাশফুলের আন্দোলন, শিউলির সুঘ্রাণ ইত্যাদি নিয়ে ন্যাকা ন্যাকা স্টেটাস দিয়ে “শরত তো এসে গেছে” টাইপ আদেখলামো করতে পারলেও আমি সেটা পারি না। ফুলে আমার বরাব্বরের আল্যার্জি, কারণটা বোধহয় তাই। আমার শরত অন্যভাবে আসে।
আগে বরং নিজের ব্যাপারে একটু বলি। আমি রথীজিৎ। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। আমি নিশ্চিত, আমার বিষয়ে আর বিশদে বলার দরকার নেই। আর পাঁচটা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার যেমন হয়, ঠিক তেমনই আমি। কাটখোট্টা জীবন, রোজ রোজ সেই একই অফিসে বসের ধ্যাতানো শুনতে শুনতে মনে মনে নিজের ভাগ্যকে গালমন্দ করা আর বিকেলবেলায় ওভারটাইম খেটে ঘরে গিয়ে খাতায় হিজিবিজি আঁকা আর হাবিজাবি লেখা। দুটোই শখে করা। কোন কলিগ জানে না। জানলে অবিশ্যি আমি খিল্লির পাত্র হয়ে যেতাম। যেচে হাঁড়িকাঠে মাথা দিতে কেই বা চায়! যে জায়গাটায় বসি, এতটুকু রোদ আসে না জানেন? টেবিলে একটা ফুলের গাছ লাগাব ভেবেছিলাম। ছোট্ট টবে একটুখানি তাজা সবুজ। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে গেলে যাতে একটু দু’দন্ড বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই। তবে শীততাপনিয়ন্ত্রত অফিসঘরে তা হবার জো আছে?
যাক গে। যা বলছিলাম। কি যেন? ও হ্যাঁ, আমার শরত। আপনারা হয়ত ভাববেন, শরতের আবার অন্যরকম আসা কি? আকাশের নীলরঙা বালিশে সাদা তুলোর মতন মেঘ, সোনা রঙের রোদ, রাত্রে আলতো শীতের আভাস শিশিরপাতের দরুণ, তাকেই তো শরত বলে। ঠিক? ভুল। আমার শরতের শুরু প্রত্যেকবার হয় যখন আমি আমাদের বাড়ির গলিটার মোড়ে ঢোকার সময় রামলখিয়াকে ওর আর ওর মেয়ের পুজোর জামাটা ওর হাতে তুলে দিই। সারাবছর ভারী কষ্ট ওদের। আমি নাহয় দূরে থাকি বলে কিছু করে উঠতে পারি না, পাড়ার লোক তো আরও এককাঠি সরেস। ওকে দিয়ে কাঁহা কাঁহা মুল্লুকে রিকশা টানিয়ে নিয়ে গিয়ে দশ-বিশ টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। বাচ্চাটার মা নেই। মদ্যপ রামলখিয়ার অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে গলায় দড়ি দিয়েছিল সে। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওদের বাড়িতে কড়িকাঠটা বেশ শক্তপোক্তই। মিনতির কোন অসুবিধাই হয়নি। তখন আমার সেকেন্ড ইয়ার। সদ্য দাদা হয়েছি পাড়ার, দায়িত্ব নিয়ে গিয়েছিলাম খবরটা পেয়ে। অনেক বুঝিয়েছিলাম ওকে। বলেছিলাম, “মিনতির জন্যে না হোক, অন্তত বাচ্চা মেয়েটার জন্যে তো এসব ছেড়ে দাও।” আমার বলার গুনেই হোক কি বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখ দেখেই হোক, তার পরের থেকেই রামলখিয়া নেশা করা ছেড়ে দেয়। পুজোতে সেবারই ওদের বাপ-বেটিকে চাঁদা করে জামা কিনে দেওয়া হয়েছিল পাড়ার তরফ থেকে। যতদূর জানি, ওই একবারই। তার পরের বছর থেকে আর কেউ না মনে রাখলেও আমি মনে রাখতাম। নিজের পকেটমানি বাঁচিয়ে হলেও ওদের জন্যে কিনে দিতাম দুটো জামা। আর আস্তে আস্তে কখন যে আমার পুজোর সংজ্ঞা আর ওদেরকে এই ভালোবেসে জামা দেওয়াটা একাত্ম হয়ে গিয়েছিল, আমি নিজেও টের পাইনি।
আমার শরত আমাদের লনের ঘাস কাটার গন্ধ থেকে আসে। অনেকে পাগলের প্রলাপ বলবেন, জানি। কিন্তু কি করি বলুন? শুরুতেই তো বলেছি, আমার শরত মনের অন্য গলি দিয়ে আসে। কিন্তু আমি তো জানি, ওই গন্ধটা আসা মানেই আমরা কাল-পরশু করে রওনা দেব আমাদের দেশের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বহুদিনের অযত্নে আগাছা যাতে গজিয়ে লনটাকে শেষ না করে দেয়, তাই এই আগাম সতর্কতা। সত্যি বলতে গেলে আমি নিজেও জানতাম না আমার দেশের বাড়িও আছে। গেল বছরের আগের বছর মা নিয়ে গেছিল। তার পরের বার থেকে মা-বাবা আর না গেলেও আমি যাই। প্রত্যেকবার নিয়ম করে যাই কেন, তার একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে।
কারণটা আর বলার দরকার আছে কি? বলা নেই কওয়া নেই, একজন ব্যাচেলর কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার কেন প্রত্যেক বছর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ ছেড়ে অজ পাড়াগাঁয়ের দেশের বাড়িতে নিদেনপক্ষে একদিনের জন্যেও যায় কেন, বুদ্ধিমান পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয়ই তা আন্দাজ করতে পেরে গেছেন। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। তার নামটা জানি না যদিও বা এখনও, তবে কল্পনাতে তো অনেক কিছুই হয়, তাই না?
মেয়েটাকে আমি প্রথম দেখি গতবছর। এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল দালানের। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, আমাদের পুজোই আমাদের দেশগ্রামের সবথেকে বড় পুজো। আমাদের ঠাকুর ভোগ না পেলে, আমাদের ঠাকুরের আরতি না হলে, এমনকি আমাদের ঠাকুরের পুজোয় পুরোহিত না বসলে আর কোন পুজোতে কোন পুরোহিত বসে না। বিরাট জায়গা জুড়ে আমাদের ঠাকুরদালান। সাধারণ বাড়ির দু-তিনটে উঠোন একত্র করলে আমাদের ঠাকুরদালানের একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে। তারই এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা। অষ্টমীর দিন দেখেছিলাম প্রথমে। লাল-সাদা সালোয়ার কামিজের কম্বিনেশন কেমন একটা অদ্ভুত লালিমা এনে দিয়েছিল। নাম জানতে পারিনি, যদিও চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। আড়চোখে দেখেই গেছি শুধু। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাকে যেন খুঁজত। সন্ধানী দৃষ্টি মেলে চাইত এদিক ওদিক। রবীন্দ্রনাথের সেই ক্ষুধিত পাষাণের মতন অবস্থা হয়েছিল আমার। গোটা গ্রাম পায়ে হেঁটে চক্কর মেরেছি খুঁজে বের করতে পারার আশায়। কিন্তু পারিনি। পুজোর সময় ঠাকুরদালানে, কিন্তু সব পুজোর পর্ব মিটে গেলেই যেন হাওয়ায় উবে যেত বেমালুম। ঠাকুমাও চিনতে পারেনি, বলেছে “দেখ আত্মীয়স্বজনের কোন সম্পর্কের কেউ কিনা।” কিন্তু তাও নয়। আমাদের কেউ নয়, নিশ্চিত জানতাম।
এবারে আমি মহালয়ার দিনই চলে যাব ওখানে। তাই অফিসেও ছুটি নিয়েছি আগেভাগে। সে কি সহজে মেলে? রাত দিন উদয়াস্ত খেটে বসের হাতে পায়ে কিলোখানেক তেল মালিশ করে তবে ছুটি মঞ্জুর করাতে পেরেছি। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম, এবারে গলির মোড়েটায় রামলখিয়া বা ওর মেয়ে, কেউই নেই। অবাক হলাম একটু। তারপর মনে হল, হয়ত ওরা ভেবে নিয়েছে আমি ষষ্ঠীর দিন ফিরব, যেমনটা হয় প্রত্যেকবার। যাক গে যাক, পরে একসময় মনে করে দিয়ে আসলেই হবে।
সকাল সকাল স্নান সেরে রওনা দিলাম দেশগ্রামের উদ্দেশ্যে। মোবাইলে বাজছে – মধুপ গুঞ্জরিল, মধুর বেদনায়, আলোকপিয়াসে অশোক মুঞ্জরিল…
গতবার স্টেটস এ কেনা আফটারশেভটা লাগিয়ে বেরিয়েছিলাম। গন্ধে এখনও গাড়ির ভেতরটা ম-ম করছে। আমি যেতে যেতে খালি ভাবছিলাম, কিভাবে খুঁজে বের করব ওকে। এরই মধ্যে কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, টেরও পেলাম না। রিকশা করে গেলাম বাড়িতে। আমায় দেখেই সবাই হইহই করতে করতে বেরিয়ে এল। মা-বাবা আসেনি বলে খানিক আক্ষেপ অনুযোগের পরে আমায় ভেতরে নিয়ে গেল ধরে। বাড়ির বড়মেয়ের ছেলে এলে যেমনটা হওয়া উচিত আর কি। ঘরে যাওয়ার পরে ঠাকুমা এল। বলল, “দা’ভাই, তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুইয়ে নিচে আয়। পুজো শুরু হয়ে যাবে।”
বলা হয়নি, আমাদের বাড়িতে মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয় মহালয়ার দিনই। আমিই প্রত্যেকবার দেরী করে আসি। যাই হোক, কোনরকমে স্নান সেরে নিয়ে সবুজ পাঞ্জাবীটা গায়ে গলিয়ে নিচে চলে এলাম। ততক্ষণে পুজো শুরু হয়ে গেছে। আমি পুজো দেখার অছিলায় এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগলাম ওকে। বেশি খুঁজতে হল না, আগের বার যেখানে ছিল দাঁড়িয়ে, এবারেও ঠিক সেইখানেই দাঁড়িয়েছে। সাহস করে এগিয়ে গিয়ে একটা গলাখাঁকারি দিয়ে বললাম, “হাই।”
কেমন একটা অদ্ভুত শূন্য চাউনি নিয়ে তাকাল আমার দিকে। পরক্ষণে হেসে বলল, “হাই।”
আমি বললাম, “আমি রথীজিৎ। আর আপনি?” উত্তর এল, “আমি দিয়া।”বললাম, “আপনাকে আগে দেখিনি এখানে। নতুন এসছেন কি? গ্রামেও তো আগে দেখিনি মনেহয়।”আমায় অবাক করে দিয়ে বলল, “কেন আগের বছর দেখেননি?”
মানে কি? এ মেয়ে কি আমাকে আগের বছর দেখে রেখেছিল নাকি?
আমি অপ্রস্তুত গলায় বললাম, “না আসলে আমি আগের বছর এত ব্যস্ত ছিলাম আর আলাপ করার সময় করে উঠতে পারিনি। তাই দেখছেন না, এবার আগে ভাগে চলে এসছি। আমি এবাড়ির বড়মেয়ের ছেলে। আর আপনি?”
বলল, “সত্যিই শুনতে চান?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ কেন নয়!”
বলল, “একবার বাইরে যাবেন? কাছেই বিশুদার চায়ের দোকান আছে, চা খেতে খেতে নাহয় বলব সবকথা।”
এ যে মেঘ না চাইতেই জল! আমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, “হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আসলে আমারও চা না খেলে ঠিক দিনটা শুরু হয় না, আমিই ভাবছিলাম বলব আপনাকে।”
আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেল। মূল ফটক থেকে একটু দূরে বিশুর দোকান। সামনে বেঞ্চ পাতা খদ্দেরদের বসার জন্যে। আমাকে বসিয়ে চা আনতে গেল। একটু পরে দুটো গ্লাস নিয়ে এসে আমার হাতে একটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, “খেয়ে নিন। তারপর কথা হবে।”
আমি বললাম, “খেয়ে নিয়ে কেন? খেতে খেতেই কথা হোক না।”
মৃদু হেসে বলল, “খেতে খেতে কথা বললে চায়ের স্বাদটা বুঝতে পারবেন না। আমার রাস্তা আপনার থেকে অনেক আলাদা। সব বলব আপনাকে, আগে খেয়ে নিন বরং।”
আমি চুমুক দিলাম চায়ে। বেশ ভালই বানায় বিশু, আলাদা ফ্লেভার থাকে একটাই। দু’চুমুক দিতে না দিতেই কেমন ঝিমুনি আসতে শুরু করল। আমি জোর করে চোখ খোলার রাখার চেষ্টা করেও করতে পারলাম না। কিরকম একটা অদ্ভুত আরাম লাগতে শুরু করল, দূর থেকে ভেসে আসা পুরুতের মন্ত্রোচ্চারণ “ওম শান্তি.. ওম শান্তি…” যেন চোখের ওপর প্রলেপ বোলাতে লাগল, ভাল করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজ্যের অন্ধকার নেমে এল আমার দু’চোখ জুড়ে।

চোখ খুললে বুঝতে পারলাম আমি অন্ধকার একটা রুমে বসে আছি একটা চেয়ারে, যেটার সঙ্গে আমি আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা। আমার মাথার ওপরে ডিম লাইট জ্বলছে একটা। আমার সামনে একটা টেবিল এর উল্টোদিকে বসে আছে দিয়া। আমার দিয়া। যাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, বুনেছিলাম হাজার আকাশকুসুম।
আমার ঘুম ভেঙ্গেছে দেখে দিয়া কথা বলতে শুরু করল। মৃত্যুর মতন হিমশীতল সে গলায় উষ্ণতার আভাসমাত্র নেই। “মিস্টার কর্মকার, লাহাবাড়ির দুর্গামূর্তির গা থেকে সোনার গয়না চুরি করা নিজের ড্রাগের দাম মেটাতে, অবৈধ ড্রাগ সেবন করা এবং রামলখিয়া সিং এর স্ত্রী মিনতিদেবীকে সেই সুবাদে খুন করার অপরাধে আপনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনি যা বলবেন, তা আপনার বিরুদ্ধে কোর্টে ব্যবহার করা হবে, সুতরাং যা বলবেন, বুঝেশুনে বলবেন।”
বলে চলল দিয়া, “লাহাবাড়ির দুর্গামূর্তি থেকে গয়না চুরি যাওয়ার ব্যাপারটা বাড়ির কাউকেই প্রায় জানতে দেওয়া হয়নি। বাড়ির কর্ত্রী নিজে গিয়ে পুলিশকে জানান, এবং আমাকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাড়ির প্রত্যেকের ওপরেই আমরা নজর রাখছিলাম, তবে আপনার হাবভাব ছিল একটু বেশিমাত্রায় সন্দেহজনক। গতবছর হাজার চেষ্টা সত্বেও গয়নাটি উদ্ধার করা যায়নি, তবে আপনার উপর নজরদারি জারি ছিল গত একবছর। আপনার দুর্ভাগ্যক্রমে, মিনতিদেবীর সুইসাইড কেসটাও আমিই তদন্ত করি, এবং তাঁর গলায় আপনার আঙ্গুলের চাপ আপনি চেষ্টা করেও মেটাতে পারেননি মিস্টার কর্মকার। সে আঙ্গুলের ছাপের সাথে আজকের গ্লাসে আপনার আঙ্গুলের ছাপ সম্পূর্ণ ভাবে মিলে যায়। প্রমাণের অভাবে আপনাকে ধরা যায়নি এতদিন। অবশ্য আমরা চাইলেই প্রমাণ যোগাড় করতে পারতাম, কিন্তু তাতে আপনার তিনটে অপরাধ একসাথে ধরা পরত না। আমাদের সৌভাগ্য, আপনি গয়নাটা চাইলেও নিয়ে যেতে পারেননি। মিনতিদেবী এমন কৌশলের সাথে সেটাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন, আমাদের মতন পুলিশরাই খুঁজে বের করতে পারেনি প্রথমে। আপনি আমার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন না? আমি দিয়া, দিয়া চট্টোপাধ্যায়। স্পেশাল ইন্ভেস্টিগেটিং এজেন্ট। আপনার ড্রাগ সাপ্প্লায়ার, যে আপনাকে খুনের সময় সাহায্য করেছিল, সেও এখন আমাদের জিম্মায়। আমাদের খালি অবাক লাগছে, আপনি কিভাবে এই পরিবেশে বড় হয়ে…”
আমার কানে আর কিছু ঢুকছিল না। আমি জানি, আজকের ঘটনার পরে আমার জন্যে বাড়ির দরজা বন্ধ। অবশ্য যদি জেল থেকে যদি ছাড়া পাই, তবে। আমি শুধু দ্রুত ভাবছিলাম, এবার আমার কি করণীয়।
খেয়াল হল, আমার পাজামার পকেটে পাজামার দড়ি কাটার ব্লেডটা এখনও আছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s