মাশুল

মেঠো রাস্তার পাশের কদমগাছটা থেকে মৌটুসী পাখিটা ডেকে উঠতে জোরে পা চালাতে শুরু করলো হারু। হারু, অর্থাৎ হারাধন সাঁপুই। বাপ – মায়ের একমাত্র ছেলে। শীতের দিন, ভোরবেলায় কুয়াশা একটু বেশিই। দুহাত দুরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না ভালো করে। হারু টর্চ নিয়ে বেরিয়েছে একটা। রাস্তাঘাটে উল্টোদিক থেকে আসা গাড়িঘোড়া যেন টের পায় তার অস্তিত্ব, তাই এই সতর্কতা। এক দিক থেকে ভালো কথা হলো এই সময়টায় সাপ-খোপ বেরয় না তেমন। মায়ের শরীরের ডান দিকটা অসাড়, তাই হারুকেই সবদিক সামলাতে হয় এখন। এখন যেমন যাচ্ছে খেজুরের রস স্টেশনে পৌঁছে দিতে। খেজুরের রস বিক্রি করে দুটো পয়সা রোজগার হয় এসময়। ক্ষেতের ধারে খেজুর গাছগুলো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। তাদের গোড়ায় অল্প গভীর একটা আঁচড় কেটে দিয়ে হাঁড়ি বেঁধে দেয়। রাতভর টুপ-টাপ রস গড়িয়ে গড়িয়ে হাঁড়িতে জমা হয় শিশিরের সাথে। শক্ত করে বাঁধন দেওয়া দরকার, নয়তো রাতবিরেতে হাঁড়ি খুলে মাটিতে পরে ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা। আলপথ ধরে তাড়াতাড়ি পা চালায় হারু। পাঁচটা দশের লোকালটা ঢোকার আগে পৌঁছনো দরকার স্টেশনে। নিমাইকাকা দাঁড়িয়ে থাকবে ওর জন্য। খানিকদূর এগোতেই গাছগুলোর অবয়ব ভেসে ওঠে। রাতভর কুয়াশায় ভিজে গেছে হাঁড়িগুলোও। চটপট অভ্যস্ত পা দিয়ে গাছ বেয়ে উঠে যায় টংয়ে, হাঁড়ি খুলে নীচে নিয়ে আসে। দুটো হাঁড়ি নিয়ে রওনা দিল স্টেশনের দিকে। মাঝে জগার দোকানে এককাপ চা খাওয়াটা ওর রোজকার রুটিন। গাঁয়েগঞ্জে সকাল সকাল সব দোকানপাট খুলে যায়। হারু যখন পৌঁছলো, জগা তখন উনুনে আঁচ দিচ্ছে। দোকানের সামনে এক কোণে জঞ্জাল ঝাঁট দিয়ে স্তুপীকৃত করা আছে। একটু দুরে একটা কালো কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে, দোকানের খরিদ্দারের উচ্ছিষ্ট পাবার আশায় রোজই থাকে। হারু ওর নাম দিয়েছে ভুলো। দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চিতে বসে হারু হাঁক পাড়ে।

— কয় রে জগা, একখান চা দে ইদিকে।

মাফলার-হনুমান টুপি পরা জগা কি বলে বোঝা দায়। জুত করে বেঞ্চিতে বসে পড়ে হারু। রেডিওতে সকালের খবরটা হয় এই সময়। চা খেতে খেতেই রাস্তা দিয়ে আনাগোনা বাড়তে থাকে লোকের, পুব দিকের আকাশটায় লাল ছোপ ধরে, এই কুয়াশাতেও বোঝা যায়। চায়ের সাথে দুটো বিস্কুট। একটা নিজে খায়, অন্যটা ভুলোকে দেয়। হারুর চা খাওয়ার ফাঁকে জগা গিয়ে একটা দেশলাই নিয়ে দিল আগুন আবর্জনাগুলোতে। উনুনের ওপরের হাওয়াটা গরম হয়ে তরলের মতন দেখায়। চা-টা খেয়ে উঠে পড়ল হারু। জগাকে ফেরার সময় পয়সা মেটাবে। বেঞ্চির তলায় রাখা হাঁড়ি দুটো দুহাতে নিয়ে পা চালালো স্টেশনের দিকে। দূর থেকে ট্রেনের ভোঁ শুনেই দিল দৌড়। হাঁপাতে হাঁপাতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে দেখে নিমাইকাকা উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই হাত নেড়ে ডাকতে শুরু করলো। হারুও হাত নেড়ে আশ্বস্ত করে এগিয়ে গিয়ে হাঁড়ি দুটো তুলে দিল কাকার হাতে। অবাক ব্যাপার হলো, আজ নিমাইকাকার কেমন কিন্তু কিন্তু ভাব। নজর এড়ায়নি হারুর।

— কি হয়েছে কাকা?
জিজ্ঞেস করলো। হাজার হোক, এই মানুষটা তো দায়িত্ব নিয়ে তার খেজুরের রসের হাঁড়িগুলো ফাঁকা করে আনে।

— আজ বিকেলের পরে ক্ষেতে থাকিস বুঝলি হারু, কথা আছে। অনেক টাকার ব্যাপার..

বুকপকেট থেকে গতকালের টাকাটা বের করে হাতে দিতে দিতে বলল নিমাই কাকা। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করতে যাবে কি ব্যাপার, ট্রেন দিল ছেড়ে। নিমাই দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়ল ট্রেনে।

আনমনা হয়ে ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে পড়ল হারু প্ল্যাটফর্ম থেকে। সামনেই নিমাইকাকার বাইকটা রাখা। হারুর অনেকদিনের শখ, অমন একটা বাইক কিনবে ও। বাপের ভাঙাচোরা সাইকেল আছে বটে একটা, তবে তা চালানো তাদের সংসারে হাতি পোষার মতন ব্যাপার। দু-বেলা পেটের ভাত জোটে না, সেখানে কি আর সাইকেল মেরামত করে চালানো হয়! অগত্যা পয়দলই ভরসা। হাঁটা লাগলো ক্ষেতের দিকে।

…..

শীতের দুপুরের নরম রোদে পিঠ দিয়ে গরম ভাত খাওয়াতে একটা বেশ আলাদা আমেজ আছে। হারুদের তিনটে বাড়ি পরে ময়নাদের বাড়ি। ওবাড়ির পুঁচকে ছুঁড়িটাকে দিয়ে ময়না পাঠিয়ে দেয় দুপুরের খাবারটা। মন্দ লাগে না খেতে। ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে দুজনে। জানে, হারুর কেমন কেমন পছন্দ। পুঁচকেটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে তার খাওয়া শেষ না হওয়া অবধি। বসতে বললেও বসবে না। খাওয়া হলে পরে থালা – বাটিগুলো নিয়ে চলে যাবে। হাওয়াটা নতুন কাটা ধানের গন্ধে ভারী হয়ে আছে। অর্ধেকটা কেটে উঠতে পেরেছে এখনও। কাস্তেগুলোরও ধার কমে গেছে, জমির মালিককে বলতে হবে। কিন্তু তার থেকেও বেশি এখন হারুর মাথায় ঘুরছে সকালে বলা নিমাইকাকার কথাটা। অনেকগুলো টাকার ব্যাপার বলতে কি বলতে চাইল ? উল্লসিত হয় হারু মনে মনে। যদি কিছু টাকা কামাতে পারে এইবার, মায়ের ওষুধগুলো কেনার পরে যেটা বাঁচবে, জমিয়ে রাখবে। খরচা করবে না। গেলবারে ময়নাকে একজোড়া কানের কিনে দিয়েছিল। তারপর থেকেই ওবাড়িতে তার খাতির বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝেই এটা-সেটা আসে বাটি করে। তৃপ্তি করে খায় হারু। আগে নিজের হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতে কি জঘন্যই না লাগত। বাপটাও সারাদিন ধরে কাজ খুঁজে বেড়ায়, রান্না করার ফুরসত নেই।

দিগন্তের দিকে সূর্যটা কখন ঢলে পড়ে টকটকে লাল হয়ে গেছে, ধান কাটতে কাটতে খেয়াল করেনি হারু। টের পেল কানের গোড়ায় হিমেল হাওয়ার সুরসুরি লাগতে। রোদ একটু মরে এলেই কনকনে ঠান্ডাটা জাঁকিয়ে পড়ে একেবারে। তড়িঘড়ি করে গামছা দিয়ে গাটা মুছে জামা পরে ওপরে একটা সোয়েটার গলিয়ে নিল। ট্রেনটা ফেরার সময় হয়ে এল। কাস্তেটা কাটা ধানের স্তুপের তলায় রেখে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগোলো স্টেশনের দিকে। নিমাইকাকা কি বলে শোনার জন্য মনটা উদগ্রীব হয়ে আছে।

স্টেশনে ঢুকে দেখল ট্রেন আসতে তখনও তিন-চার মিনিট দেরী আছে। চুপচাপ একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ল হারু। ওই শেষ কথাটাই ধন্দে ফেলেছে। যাক গে, যা জানবার একটু পরেই তো জানতে পারবে – এই বলে মনকে প্রবোধ দিল। মুখের ওপর একটা জোরালো আলো এসে পড়ায় দেখল ট্রেন ঢুকছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে উঠে দাঁড়িয়ে এগোলো পায়ে পায়ে। নিমাইকাকা দেখতে পেয়েছে ঠিক।

–অ্যাই হারু, আমি এখানে।

আজ একটু বেশিই দেরী করে ফেলেছে ট্রেনটা। বাড়িতে অসুস্থ মাটা তার জন্য পথ চেয়ে শুয়ে থাকবে। সন্ধ্যাদিকে বলে পাঠিয়েছে যদিও ছুঁড়িটাকে দিয়ে, তবুও একটা চিন্তা থেকেই যায়। হারু তাড়াতাড়ি এগিয়ে কাছে গেল।

–বলো কি বলবে বলেছিলে।

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগোচ্ছিল হারু। উত্তেজনায় কান-মাথা গরম হয়ে উঠেছে। একটু আগে যা শুনে এলো! ব্যাপারটা একটু রিস্কি ঠিকই, তবে যাতে হাতে দু’পয়সা আসে, তার ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে নিমাইকাকা। হাতের টেপা বাতিটা দুলে যাচ্ছে মাটিতে পা ফেলার তালে তালে। বাঁকটা মোড় নিতেই শালমোড়া একটা অবয়ব এসে দাঁড়ায় সামনে। নাক অবধি শালটা তুলে রেখেছে। ভালো করে চেয়ে চিনতে পারে হারু। ময়না। একটু অবাকই হল হারু, কারণ ময়না কোনদিন তার জন্য ফেরার পথে দাঁড়ায় না।

— জলদি ঘরপানে যা রে হারু, তুর মাটার শরীল খারাপ হইছে আবার।

আবার!

দিশাহারার মতন ছুটতে শুরু করলো হারু। ঘরে ঢুকে দেখল মা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তড়িঘড়ি রামুদাকে ডেকে ওর সাইকেলভ্যানটা বের করতে বলল। হাসপাতালে নিয়ে জেতে হবে। তাও সেখানকার লোকগুলোর যা রোয়াব, ভর্তি নিলে হয়। বাপটা উদভ্রান্তের মতন বসে আছে ঘরের মাটিতে। যেন বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। ঝটপট বাক্সটা খুলে হাতড়িয়ে যে কটা টাকা পেল, গুঁজে নিল ট্যাঁকে। মাটাকে ভর্তি করেই ফেরত আসতে হবে। টাকাটা যোগাড় না করলেই নয়।

…..

আবার একটা ভোরের শুরু হল। কাল সারারাত হাসপাতালে কেটেছে । ডাক্তারের রায় হল দু-দিনের মধ্যে অপারেশন করতে হবে, নয়তো রোগীর দায় তাদের নয়। সেটাও ঠারে ঠারে বুঝিয়ে দিয়েছে। আর যেটা বুঝিয়েছে সেটা হল টাকার অঙ্কটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হবে। হারু ভেবেছে কাল সারারাত ধরে, মায়ের বেডের পাশে বসে। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাজটা সে করবে। তার মায়ের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে এটুকু সে করতেই পারে।

ভালো করে মাফলারটা গলায় জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল হারু। শেষরাতের বাসটা ধরে ফিরেছে ঘরে। বাপটা মেঝের ওপরেই ঘুমিয়ে গেছে। কাল রাত্রে কিছু খায়নি মনে হয়। ময়না রয়েছে হাসপাতালে মায়ের সাথে। আলতো করে কম্বলটা বাপের গায়ে বিছিয়ে দিয়েছিল। তাড়াতাড়ি পৌঁছনো দরকার স্টেশনে। হাঁড়িদুটো গাছ থেকে নামিয়ে নিয়ে পা চালালো। আজ আর জগার দোকানে বসে চা খাওয়া হবে না। দোকানটা পেরোনোর সময় দেখল খোলেনি তখনও। হাঁড়িদুটো নিয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেখল নিমাইকাকা দাঁড়িয়ে।

— এনেছিস?

বেশি কথা না বলে হারু হাঁড়িদুটো তুলে ওপরের খাপটা খুলে দিল একটু। পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে গুঁড়ো গুঁড়ো কী ছড়িয়ে দিল দুটোর মধ্যে। নিমাই বুকপকেট থেকে একগোছা নোট বের করে তার হাতে গুঁজে বলল

— আর কি, কপাল তো খুলে গেল তোর। বাবুদা যখন একবার তোর কথা ভেবেছে, মালামাল হয়ে যাবি দুদিনের মধ্যেই, দেখ না।

মালামাল হয় নাকি গোলমাল, সেটা সময়ই বলবে – মনে মনে বলল হারু। এখন অর বেশি দুশ্চিন্তা ওর মাটাকে নিয়ে। কি অবস্থায় আছে কে জানে। ফোনটাও তাড়াহুড়োতে বাড়িতেই ফেলে এসছে। বাইরে বেরিয়েই একটা ট্যাক্সি নিল। সদর যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে এলিয়ে দিল শরীরটাকে সিটে। হাজার হোক, কাল থেকে কাল ধকল যায়নি। এক ঘন্টাও ঘুমোতে পারেনি ঠিক করে।

নিজের অজান্তেই চোখ দুটো বুঁজে এসছিল হারুর। কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, টের পায়নি। চটকাটা ভাঙল ট্যাক্সি ড্রাইভারের ডাকে। উঠে ভাড়াটা হাতে গুঁজে দিয়ে ঢুকলো ভেতরে। কড়া ফিনাইলের গন্ধ। ব্যস্ত হয়ে ওয়ার্ডবয়রা ছোটাছুটি করছে এদিক-ওদিক। গা গুলিয়ে উঠলো হারুর। টলতে টলতে পাশের বাথরুমটায় ঢুকে পড়ল। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দু-চারবার ওয়াক ওয়াক করা সত্ত্বেও কিছু বেরোলো না । এটাই সবথেকে বিরক্তিকর লাগে। এখন এই ভাবটাও যাবে না। বেসিনের উল্টোদিকে মানুষসমান আয়না।  নিজের মুখটা ভালো করে দেখল। চোখের কোণে কালি জমেছে। রাত জাগার ফল। মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এলো বাথরুম থেকে। রিসেপশনে নিজের পরিচয়পত্র দেখিয়ে পাস কালেক্ট করল। সিকিউরিটিকে দেখিয়ে ঢুকে পড়ল ওয়ার্ডে। ডান দিকের তিন নম্বর কেবিন। সার দিয়ে ছটা বেড পর পর সাজানো। দু নম্বরটাতে মা আছে। কিন্তু কেবিনে ঢোকার আগেই ময়না বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। দেখতে পেয়েছিল মনেহয়। আলুথালু চুল, মাথার টিপটা থেবড়ে গেছে। চোখ গুলো লাল হয়ে আছে। চেহারাটা দেখে মনের মধ্যে একটা আশংকা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো হারুর। প্রবল চেষ্টায় দমন করলো সেটাকে। জানতে চাইল,

— কি হইছে?

উল্টোদিক থেকে উত্তরের বদলে শুধুই নিস্তব্ধতা। হারু বুঝল, তার আশঙ্কাটাই সত্যিতে পরিণত হতে চলেছে। ধাক্কা মেরে সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে, দরজাটা খুলতেই নাকে এসে ঝাপটা মারলো গন্ধটা। আগেও পেয়েছিল, জ্যাঠা মারা যাওয়ার সময়। ঠিক বুঝতে পারে না কীসের, কিন্তু বিলক্ষণ জানে, গন্ধটা কি ইঙ্গিত করে। পোড়া তেল, মাংস আর ক্যাপসুলের ওষুধ-ওষুধ গন্ধটার একটা মিশেল। নাকে ঢুকতেই কি হল কে জানে, মনে হল পেটটা একবার মচর দিয়ে উঠলো। পরক্ষণেই হড়হড় করে বমি করে ভাসিয়ে দিল ওয়ার্ডের মেঝেটা। নার্সরা ছুটে এসে না ধরলে পড়েই যেত। ওকেও নিয়ে যেতে যাবে, হাত দিয়ে আটকাল।

— আমি ঠিক আছি।

উঠে দাঁড়ালো। টলমল পায়ে হাঁটতে শুরু করলো বাইরের দিকে। কানের মধ্যে ফিসফাস ভেসে আসছে,

— কি কুলাঙ্গার ছেলে।  মা মারা গেছে, মরা মুখটা পর্যন্ত দেখল না।

— টাকাটাও তো পুরো দেয়নি বোধহয়…

মনে মনে হাসি পেল হারুর। অন্যসময় হলে একহাত নিত লোকগুলোকে। এদের কাজই হল অন্যদের সমালোচনা করা।  ওয়ার্ড থেকে বের হতে যাবে, ময়না এসে পথ আগলাল।

–কোথায় যাচ্ছিস?

জবাবে মৃদু হাসল হারু। আলতো স্বরে বলল,

–বাপটার খেয়াল রাখিস। আমি ফিরব কুটা দিনের মধ্যেই।

হতভম্ব ময়নার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল হারু। হাসপাতালের বাইরে এসে আবার একটা ট্যাক্সি নিল।

–থানায় চল।

বলল ট্যাক্সিওয়ালাকে।

……….

থানাতে নিজের চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিলেন সমাদ্দারবাবু। ইন্সপেক্টর ইন চার্জ। একজন আর্দালি এসে জানালো, একজন আত্মসমর্পণ করতে চায়। লোকটাকে নিয়ে আসতে হুকুম দিলেন তিনি। আর্দালি বেরিয়ে গেলে নিজের কোমরের বেল্টটা ঠিক করতে করতে মনে মনে একবার হেসে নিলেন সমাদ্দারবাবু। ভালো কোনো কেস হলে তাঁর প্রমোশনটা কেউ আটকাতে পারবে না।

খানিক পরে আর্দালি একটা লোককে দরজা অবধি এগিয়ে দিল। ভিতরে আসতে বললেন তিনি। লোকটা এসে উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসলে তিনি জানতে চাইলেন,

–তা কি করেছেন? খুন-চুরি-ডাকাতি-রেপ, কোনটা?

আশ্চর্য রকমের চুপ থেকে লোকটা পকেট থেকে সাত-আটটা প্যাকেট বের করে তাঁর টেবিলে ফেলে দিল। দেখে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ!

-এগুলো কোথায় পেলেন?

খানিক পরে থানা থেকে সার দিয়ে তিনটে ফোর্সভর্তি গাড়ি বেরিয়ে গেল হুইশল বাজাতে বাজাতে। ভেতরে নিজের হাতে হাতকড়া লাগাতে লাগাতে হারু ভাবছিল অনেক কথা। মাটা মরে গেল, সেজন্যে তার অতটা দুঃখ নেই। কষ্ট পেয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে সুখের স্মৃতি নিয়ে ঝরে যাওয়া অনেক ভাল। অনেকটা ফুলের মতন – জোর করে জলে দিয়ে দিয়ে পচিয়ে ফেলার চেয়ে সুগন্ধ ছড়িয়ে পাপড়ি খসিয়ে যাওয়াটাই তাকে বেশি মানায়। বরং এই ভালো। মায়ের আদরের স্পর্শটুকু বেঁচে থাক। তার বাপটা হয়ত কষ্ট পাবে একটু। তাকে না দেখে চিন্তাও করবে। কিন্তু হারু জানে, যাকে বলে এসছে সেই খেয়াল রাখবে তার বাপটার।

হারু নিশ্চিত জানে।

 

—– শেষ —–

Advertisements

2 thoughts on “মাশুল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s