অরণ্য আখ্যান : পর্ব ১

মেঘটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে চেয়েছিল অরণ্য। শ্যাঁওলা রঙের মেঘটা। ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে একফালি আকাশটায়।  জানলার গ্রিলগুলোয় বৃষ্টির দু-চারটে ফোঁটা আটকে আছে। একটা বেশ বড় হয়ে উঠেছে, যে কোন সময় ঝরে পড়বে।
নীচের জানলাটা বন্ধ। আধো-অন্ধকার হয়ে আছে ঘরটা। একটু আগে মোবাইলে দেখেছে, আটটা বেজে গেছে। তাও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। খাটটা ছোট হয় এখন। আগে হাত পা ছড়িয়ে শুতো। মা বলত, “খাট জুড়ে রাজত্ব করিস রাতে।” তা অরণ্যও জানে, কথাটা  মিথ্যে নয়। বরাব্বরই ওমনি শুয়ে এসেছে । মাঝেসাঝে খেলা থাকলে বিছানার ধারে থাকত ফ্লাস্ক। তারও ধারে কফিমগ। কফিই কাফি। আর চিন্তা নেই। রাত জাগতে জাগতে ঢুলতে ঢুলতে রিমোটে মাথা ঠুকবে না। বইয়ে মুখ গুঁজে পড়বে না ধপ্ করে। চমকে উঠতে হয়। এই কোথাও কিছু পড়ল বুঝি। কোনও লাশ ফেলল কেউ হাইরাইজের ওপরতলা থেকে। অ্যাম্বুলেন্স-পুলিশ-সাইরেন-নিদ্রালুচোখ পাড়াপড়শিদের উঁকিঝুঁকি। উদ্ভট সব চিন্তা ঘোরে মাথায় রাত হলেই। পরক্ষণে খেয়াল হয়। স্ব-মুন্ডু-ঠোকার আওয়াজ। এক শব্দে কী ভাবে বলা যায়? একনামে প্রকাশ করো। যে নারী কোনওদিন সূর্যের মুখ দেখেনি – অসূর্যম্শ্পশ্যা। ব্যাকরণ।
সে যাক। মেঘটাকে এখন আর প্রায় দেখা যাচ্ছে না। জানালার ওপরের বাঁ দিকের কোণটায় খালি ল্যাজাটা দেখা যাচ্ছে। সকাল সাতটার আকাশবাণীতে নিশ্চয়ই বলেছে, হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় এত মাইল। বৃষ্টিপাত এত মিলিমিটার। এককের নামগুলো কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। মাইল শুনলে মাইলো মনে পড়ে। ছোটবেলার কফির সাবস্টিটিউট। মিলি শুনলে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুঁচকিটা, যার ছবি তুলে দিয়েছিল। আর মিটার শুনলে ফেলুদা।
অকস্মাৎ মোবাইলে জলতরঙ্গ বাজে। কী হলো? মেসেজ এসছে। গোটা গোটা হরফে লেখা – কই রে? আয়!
তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। দেওয়ালে মা তারার ছবি আঁকা(বলা ভাল, প্রিন্ট করা) ক্যালেন্ডারটার পাশে সাঁটানো হ্যাঙ্গারটার থেকে ঝোলানো হলুদ টিশার্টটা গায়ে গলিয়ে নেয়। স্খলিত পায়ে বেরিয়ে আসে। বাইরে সোঁদামাটির সঙ্গে ডিটারজেন্টের গন্ধ। রেলিংয়ে সার সার জামাকাপড় মেলা। গোলাপি, খয়েরি, সবুজ। তার আকাশী গেঞ্জিটাও ঝুলছে এককোণে অপারগ হয়ে। একটু পড়েই মা দেখতে এসে শাপশাপান্ত করবে।
-“কী করে কেচেছ ঊষা? ময়লা যায়ইনি তো।”
নীচ থেকে জবাব আসবে, “গেছে গো বউদি গেছে। শুকোলে দেখো।”
এসব নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গা-সওয়া হয়ে গেছে। এটাও জানে, বাইরে যতই এ ওর ওপরে চেঁচামেচি করুক, আদতে ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকের প্রত্যেককে লাগবে। ছোটবেলায় পড়া না করে গল্পের বই পড়লে রিপোর্ট চলে যেত রান্নাঘরে। তার পর যথারীতি এসে মার। অনেকদিন ভাবতে হয়েছে, রহস্যটা কী! মা কী সুপারওম্যান নাকি! রোমাঞ্চও হত। টিভিতে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখার বয়স তখন। আর পোগো। অসওয়াল্ড। নডি। টম অ্যান্ড জেরি। অকৃত্রিম। কল্পনার দৌড় কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় শেষ হয়! মা কেপ পড়ে উড়ছে আকাশে, এমন ভাবনাও এসছে মাথায়। এখন মনে পড়লে হাসি পায়।
-“উঠে পড়েছিস?”
সম্বিৎ ফিরল। মিচকি মিচকি হাসছিল এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি আর সার্ফ এক্সেলের জলে বারান্দা জলময়। সন্তপর্ণে পায়ের চটিটাকে পায়ের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝে আঁকড়ে ধরে এগোয় বাথরুমের দিকে। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে তাকালে দেখা যায়, উল্টোদিকের দেওয়ালে তাকের ওপরে শ্যাম্পু আর সাবানের কৌটো। নীচের তাকে শার্ফ এক্সেল ভরা কৌটো। পাশে ভেজা হুইল ওকে সাবানের বাক্স। জল লেগে কৌটোর গায়ে। হাঁড়ির গায়ে লেগে থাকা রসের মতন গড়িয়ে পড়ছে। চ্যাটচেটে দেখতে লাগলেও আদতে সাবানজল। হাতে নিয়ে ঘষলেই ফেনা হবে। স্যাঁতসেঁতে হাওয়াটা। বেসিনের কল তিনবার ঘোরালে পুরো তোড়ে জল বেরোয়। জলের ছিটে এসে লাগলেও ভ্রুক্ষেপ নেই। জলটা ঠান্ডা। পরিষ্কার। একটু আয়রনের গন্ধ আছে বটে, তবে সেটাও গা-সওয়া। পরিচিত। বাইরে কোথাও এমনি গন্ধওয়ালা জল পেলে বাড়ির কথা মনে পড়ে। মনটা উদাস হয়ে গেল অরণ্যর।
লোহার গেটটা ঠেলে বেরিয়ে ভেজা রাস্তাটা ধরে এগোয়। ঝরাপাতাগুলো দলা পাকিয়ে গেছে। এখানে ওখানে শালগাছগুলোরও ভাঙা ডাঁটি পড়ে। পাতাসমেত। গায়ে এখনও খসে পড়া শালফুলগুলোর পাপড়ি লেগে। জোলো হাওয়াটা যতবার দিচ্ছে, টুপটাপ শব্দ উঠছে চারদিকে। পাতা থেকে জমে থাকা জলটুকু নীচের পাতায় পড়ে। হায়ারার্কি। নিজের অজান্তেই গালটা চুলকে নিল একবার। দু-তিন দিনের না কামানো দাড়ির আভাস। একবার একটা জলট্যাঙ্কি পেরোলো। এবার একটা মোড়। সেটা পেরিয়ে একটু এগোলেই বাসস্টপ।
বাসে চেপে একটা জানলার পাশের পাশের সিটটায় বসল। জানলার পাশেরটা ভিজে আছে। জলের ছিটে পড়ে। নির্ঘাত বন্ধ করেনি। জানলার নীচে রবারের কোটিংগুলো ছিঁড়ে গেছে। টলটল করছে জল। কনুই রাখলেই উপচে পড়বে। জানলাটা খোলা। ঠান্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা মারছে মুখে চোখে। আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। টিশার্টটা লেপটে যায় শরীরের সাথে। ইতিমধ্যে কন্ডাক্টর টিকিট চাইতে এলো। সিট থেকে তিন ইঞ্চি উঠে সামনে চল্লিশ ডিগ্রি ঝুঁকে মানিব্যাগটা বের করতে যাবে, কন্ডাক্টর সুরুৎ করে পকেট থেকে একটা কাপড় বের করে পাশের সিটটা মুছে দিল। তারপর
“সরুন দাদা সরে বসুন, আরও লোক উঠবে গাড়িতে।”
সরে গেল। দশ টাকার নোট দিল কন্ডাক্টরকে।
-“আর দুটাকা।”
-“অ্যাঁ?”
-“আপনি কোথায় নামবেন? ভগৎ সিং তো?”
-“না না, বিধান।”
-“হ্যাঁ, আরও দুটাকা দিন।”
দিল। টিকিটও নিল। হাতের মুঠোয় পুরে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। এর মধ্যে তিন চারবার টুংটাং করেছে। খুলে দেখল হোয়্যাটসঅ্যাপে মেসেজ এসছে।  প্রায় দশ-বারোটা আলাদা আলাদা চ্যাট থেকে। তারমধ্যে খানসাতেক গুড মর্ণিং-শেয়ারকরুননয়তোপস্তাবেন ইত্যাদি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে এদেরকে ব্লক মারতে। মাকে দেখিয়ে বলেওছিল। বারণ করেছে।
-“আত্মীয় না? পরে জানতে চাইলে কী জবাব দিবি?”
-“তাহলে বলে দি’! এসব আমার ভালো লাগে না।”
-“হ্যাঁ, দিয়ে সবাই বলুক আমরা কোন শিক্ষাদীক্ষা দিইনি। একদম না।”
-“তাহলে কী করব?”
-“না দেখলেই হলো। বা উত্তর দিয়ে দিবি।”
-“হ্যাঁ ঐ করি আর কি! সক্কাল সক্কাল রোজ রোজ পটি করার মতন এদেরকেও উইশ করতে হবে। একটা ফোনও তো করে না।”
-“ভাগ্!”
ধরে সবকটাকে সিলেক্ট করে উড়িয়ে দিল।  যা হয় দেখা যাবে। মেসেজগুলির সাতটি গেল, রইল পড়ে তিন। তার মধ্যে দুটো গ্রুপের। আর একটায় চারটে মেসেজ এসছে। বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে শেষটায় চারটে লালমুখো-ভুরুকুঁচকানো ইমোটিকন। মানে রেগে গেছে। খুলল।
-“কই রে?”
-“আর কতক্ষণ বসব?”
-“দূর হ’ হতচ্ছাড়া। দেখা করতে বলাটাই ভুল হয়েছে।”
“বাসে আছি। আসছি।” লিখে পাঠিয়ে দিল।
আপাতত বাসটা দাঁড়িয়ে। সিটি সেন্টার। হইহট্টগোলে সরগরম।
“দাদা কলকাতার বাস কোথায় ধরব?”
“এটা চিত্রালয় যাবে দাদা?”
“সেপকো-সেপকো-সেপকো-বিজোন-ভগৎ সিং-সেন্ট্রাল…”
“দাদা বাদাম নেবেন? বাদাম-লেবুলজেঞ্চুস-ডালমুট-মটর…”
দাদা-ভাই-কাকা-ভাইপো-চাচা-চাচীর সম্মন্ধ। দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে।।
পাশ দিয়ে একটা বেনাচিতির বাস বেরিয়ে গেল। রুপোলী ধোঁওয়াটা ডানা মেলল হাওয়ায়। তার পিছু পিছু এটাও নড়তে শুরু করল। আট-দশটা স্টপ পেরিয়ে যখন নামল, তখনও ঘননীল মেঘে ঢাকা আকাশ। একটু দূরে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ওর মতোই।
-“নমস্কার।”
-“না এলেই পারতি। আর কবে সময়জ্ঞান হবে?”
-“আরে বাস আটকে গেছিলো তো!”
-“হুঁহ। এনেছিস?”
-“হুম।”
-“কই? দে।”
পকেট থেকে ক্যাডবেরি ডেয়ারি মিল্কের প্যাকেট বেরোলো। তার ভেতর থেকে প্লাস্টিকের খাপ। মাঝখানে পুঁচকিমতন গুটিশুটি মেরে একটা চিপ।
-“সব কটা আছে।”
ছবি। পুরনো দিনের তোলা, নস্টালজিয়া মেশানো ছবির কথা বলা হচ্ছে।
-“মুখ গোমড়া কেন?”
-“মনখারাপ।”
-“কেন?”
-“‘মেঘপিওনের ব্যাগের ভিতর মনখারাপের দিস্তা/মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা।”
-“হ্যাট্। কবিতা না আওড়ে বল্। কী হয়েছে?”
-“চলে যেতে হবে।”
-“সে তো হবেই। পৃথিবীতে সবাই অমর নাকি?”
-“আহা, ফেরত যেতে হবে। মন খারাপ হবে না? কতদিন বাড়ি আসিনি। এক-দু’মাস না থাকলে পোষায়, বল্?”
-“হুম। পোলাও-খিদে পেয়েছে তো?”
-“না মানে…”
-“থাক্। হয়েছে। ন্যাকাচন্ডী। কাল আসবি।”
অন্য কেউ হলে তুলকালাম হয়ে যেত, নেহাত…। ঝিরঝিরে ঠান্ডা হাওয়াটাও বেশ মনোরম লাগছে। পাশাপাশি হাঁটা। খোলা চুলের একটা-দুটো এসে কানের ডগায় সুড়সুড়ি দেয়। রাস্তার একধারে ঘেরাটোপে দেবদারু গাছ। চিড়িয়াখানা যেন। ঘেরাটোপে ইঁটের জ্যামিতিক নকশা। অন্যদিকে ধু-ধু মাঠ। কলাপাতারঙা সবুজ।
-“তোকে দেখে একটা গান মনে পড়ছে।”
চটকা ভাঙে।
-“অ্যাঁ? গান?”
-“হুম।” ফিক করে হেসে ফেলে।
-“কর্। কতদিন শুনিনি।”
-“বাব্বাঃ। কে এলেন আমার ফ্যান!”
চুপচাপ পদক্ষেপ এগোতে থাকে রাস্তায়। হঠাৎ পাশ থেকে গুনগুনানি ভেসে আসে কানে।
“শ্যামল শোভন নববরষায় কিশোর দূত কি এলে…”
গান থামলে পরে জানতে চায় – “আমি কালো নাকি? ফরসা তো!”
-“স্পিরিটটা দেখ্, গঙ্গারাম! ছাগলেও বোঝে।”
বোঝে বৈকি। আজকে ঘরে মেনু ঝুরঝুরে আলুভাজা, মুগের ডাল। শাদা গরম ভাত। খাসির ঝোল। আঃ। শান্তি।
-“আজ খাবি চল্।”
যুগল পদক্ষেপ ফিরতে থাকে। রাস্তা পায়ে চলার পথ বাৎলে দেয়। ছায়ামাখা স্ট্যান্ডে ফেরত আসে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে দুটো অবয়ব। প্রতীক্ষা, কখন গাড়ি আসবে, পৌঁছে দেবে গন্তব্যে…।
কিছু কিছু প্রতীক্ষা কখনও শেষ না হলে ভালোই লাগে।
কিছু কিছু প্রতীক্ষা কখনও শেষ হয় না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s