অরণ্য আখ্যান : পর্ব ২

বিকেলেও মাঝে মাঝে ভোর নামে। শালপাতা দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়ে আলোটা। ভিজে গেছে যেন। অথচ, তাতে হলুদ-লালের রেশমাত্র নেই। শুধু নীল। গাঢ় ময়ূরকণ্ঠী নীল রঙা আলো। ঝিরিঝিরি হাওয়ার সাথে খসে খসে পড়তে থাকে পাতাগুলো। ইতিউতি টুপটাপ শালফুল নেমে এসে সঙ্গ দেয়। এক একটা পাতার খসে যাওয়ার সাথে সাথে একটা একটা করে নতুন আলো জন্ম নেয়। বনময় অজস্র আলোর বিন্দু কথা কয়ে বেড়ায়। কথা বলে কাঠবিড়ালি, পিউ-কাঁহাদের সঙ্গে। গাছের মোটা কালো গুঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ে রজন। নীলরঙা আলোয় ঝিলমিল করে। অরণ্যানীর পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে সহাবস্থান। শুধু, পিয়াল গাছের তলাটুকু হলুদ হয়ে থাকে।

রেলরাস্তার দু’পাশ দিয়ে সাঁইসাঁই ছুটছিল বনানী। অরণ্যর উল্টোমুখে। রাস্তা কখনও চড়াই, কখনও উৎরাই। শাল-সেগুন ছাড়াও দেবদারু গাছের সারি দাঁড়িয়ে আছে, ক্ষণিকের অভ্যর্থনার জন্যে। খোলা সুগন্ধি হাওয়াটার ঝাপটা এসে মুখে লাগে। শালফুলের গন্ধ বড্ড তীব্র। বেশিক্ষণ শুঁকলে মাথা ব্যথা করে। ট্রেনটার মধ্যে আরেকটা অদ্ভুত গন্ধ। মশলা দিয়ে মাখা ছোলা, ঝালমুড়ি ইত্যাদির সাথে আরও একটা কী বেশ অজানা কিন্তু তবুও খুব চেনা ঝাঁঝালো গন্ধের মিশেল।
কামরায় বেশি ভিড় নেই। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা মেরেকেটে দশ-বারোজন লোক হবে। ট্রেনের দুলুনির সাথে সবাই দুলছে। ওপরের হাতলগুলোও। ফ্যানের আর খোলা জানলা দিয়ে আসা হুহু হাওয়ার যুগপৎ তাড়ায় ফ্যান আর টিউবলাইটের গ্রিলগুলোয় লেগে থাকা ঝুলগুলোও উড়ছে। কয়েকটা ছিঁড়ে গিয়ে আধখানা হয়ে গেছে। কামরার দেওয়ালে, গুনে দেখা গেল, ঠিক চারটে রেলমন্ত্রকের সচেতনতা বিষয়ক পোস্টার আধছেঁড়া অবস্থায় চেটানো। ভেস্টিবিউলের পাশে দেওয়ালে ফোন নম্বর লেখা। মেঝেতে চিপসের খালি প্যাকেট,বাদামের ঠোঙা গড়াগড়ি খাচ্ছে। প্যাকেটের গায়ে স্ন্যাক্স লেখা। কমলা-হলুদ স্ট্রাইপ দেওয়া।

-মুড়িইইইইইই, মুড়িইইইইইই, ঝাআআআলমুড়িইই।

হঠাৎ হাঁকে চমকে যেতে হয়। আধময়লা ছাইরঙা ফতুয়া আর ধুলোলাগা কালো প্যান্ট পরনে, সামনে বড় টিনের ডাব্বায় সাজানো পরপর কৌটোয় চানাচুর, সেউভাজা, আলুসেদ্ধ, কাঁচালঙ্কাকুচি, পেঁয়াজকুচি, ছোলামাখা, ঝাল স্বাদের দু-তিনরকম মশলা, সর্ষের তেল, নারকোলকুচি। মাঝখানে বড় কৌটোয় মুড়ি। ডাব্বার ধার থেকে ছোট দুধের ক্যান ঝুলছে একদিকে, অন্যদিকে কয়েক আঁটি ধনেপাতা। ক্যানের মধ্যে মুড়ি মাখা হবে।

-কত করে দাদা?
-দশ আছে, কুড়ি আছে। কোনটা নেবেন?
-দশেরটাই দিন।

কৌতূহল হয়, কেউ কী কোনদিন কুড়ি টাকারটা কিনেছে? ভাবনায় যতিচিহ্ন পড়ে মুড়িমাখার গন্ধে। মাখাটাও এক ধরণের আর্ট। সবার মনোমতন চাহিদা মিটিয়ে সব উপকরণ ঠিক ঠিক পরিমাণে দিয়ে দ্রুত হাতে মুড়ি সবাই মাখতে পারে না। সব মেখে ঠোঙায় ঢেলে একটা বড় নারকোলের টুকরো দিয়ে হাতে হাতে আদানপ্রদান হয়। টাকার আর খাবারের।

ঝালমুড়ি খাওয়ারও ধরণ আছে। দু-তিন রকম। যারা চামচে করে খায় তারা নমস্য ব্যক্তি। কয়েকজন ঠোঙা থেকে সোজসুজি মুখে চালান করে। ঠোঙাটাকে ঠিক কোণে উঁচু করে আলগা ভাবে তিন-চারটে চাপড় ঠোঙার গায়ে পড়তেই মুড়ির ঢল নামে মুখে। সময় বুঝে নামিয়ে নিতে হয় হাতখানা। বেশিরভাগ ঠোঙাটাকে অল্প কাত করে হাতে নেয় খানিকটা মুড়ি। তারপর হাত থেকে মুখে চালান হয়। রসনার পরিতৃপ্তি। মুখের মধ্যে স্বাদের বিস্ফোরণ ঘটে।

ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপট এসে গায়ে লাগল। সাথে নাকে সোঁদা মাটির গন্ধ। মুড়ি খাওয়া শেষ করে বেসিনের নীচে লাগোয়া ডাস্টবিনে ঠোঙা ফেলে হাত ধুয়ে নিল একবার। ঘাড়ে-মুখেও জলের ছিটে দিল। ফেরত গিয়ে বসল নিজের জায়গায়।

-রাত্রে বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।

সামনের সহযাত্রীর মন্তব্য। মৃদু হেসে জবাব দিল,

  • হোক না। ট্রেনের ভেতরে আছি তো। অসুবিধে নেই।
  • না মানে, জানলা দিয়ে জল আসবে না?

ওঃ।

  • আপনি ওপরে যাবেন আমার জায়গায়?
  • অ্যাঁ? হ্যাঁ হ্যাঁ খুব ভালো হয় তাহলে।
  • বেশ। আমি আপনার বার্থে শুয়ে পড়ব।
  • ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ভাইটি। কোথায় যাচ্ছ?
  • ঘুরতে। আপনি?
  • আমি ঐ, হেঁহেঁ, বুঝলে কিনা, কাজে। এই কাল সকালেই নেমে যাব।
    -আচ্ছা বেশ।

আর কথা বাড়ানো হল না। রাতের ট্রেনের মজাই এই। বেশিরভাগ লোকেই নিস্তব্ধতা চায়। নিরিবিলি একটা কোণ চায়। ঘরের মতন। শুধু সে আর তার কল্পনা থাকবে সেখানে। তার সুখ থাকবে। আরাম থাকবে। চোখ বুঝে নিঃশব্দ ভেদ করা ট্রেনের একঘেয়ে চাকার আওয়াজের সাথে দুলুনি থাকবে। আর কেউ নয়।

রাত হচ্ছে। কামরার সব আলোই নিভছে একে একে। সামনের ভদ্রলোকটিরও খাওয়া শেষ। হাত ধুয়ে এসে বললেন

-ভায়া একটু ধরো তো। সিটটা তুলে নিই।

উঠল। সিট ঠেকানো অবস্থা থেকে আড়াআড়ি অবস্থায় এল। চেন নামিয়ে সিটের গায়ে লাগানো হুকের সাথে আটকে দিল।

-আলোটা নিভিয়ে দিই?

ভদ্রলোক অবাক হয়ে জানতে চাইলেন

-তুমি খাবে না?

মুচকি হাসল অরণ্য।

-আমার খিদে নেই। আমি বরং আলোটা নিভিয়ে দিচ্ছি, আপনি শুয়ে পড়ুন।

তার দিকে অবাক একটা দৃষ্টি দিয়ে উঠে গেলেন ভদ্রলোক। আলোটা নিভিয়ে দিয়ে জানলার ধারে কাত হয়ে বসল সে। সোজা বসতে গেলে মাথা ঠুকে যায়। সোঁদা গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। ঠান্ডা গ্রিলটা। একটা ভ্রুর ওপরে, একটা চোখের একটু নীচে, আরেকটা নাক আর ঠোঁটের ঠিক মাঝখানে। ঠান্ডা স্পর্শে ভেতরটাও ঠান্ডা করে দিচ্ছে।

একটু পরে জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে শুয়ে পড়ল সে। রাতের ট্রেন ছুটে চলল গন্তব্যের উদ্দেশে। মধ্যযামের বুক চিরে আলোর রেখা দিয়ে ফালাফালা করে অন্ধকারকে কাটতে কাটতে, অজানা স্টেশন পেরোতে থাকল এ

কের পর এক।

খানিকক্ষণ বাদে, যখন কামরার সবাই সুপ্তিমগ্ন, জানলার কাঁচে রুমঝুম শব্দে বৃষ্টিফোঁটার দল নামল নাচতে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s