অরণ্য আখ্যান : পর্ব ৩

…এ মহানগর ঘুমায় না। হলদে হ্যালোজেন সহস্রচক্ষু মেলে পাহারা দেয় এখানে। মফস্বলের অন্ধকার গলির রাতচৌকির বাঁশি এখানে গুমরে গুমরে ঘোরে কোনো কানাগলির ভেতরে। রাত বাড়লে শহরের ভেতর জেগে ওঠে আরও একটা শহর। তার গায়ে লেগে থাকে আলকোহলের ঝাঁঝালো গন্ধ। তার মধ্যে তখন পর পর নিভে যাওয়া ফ্ল্যাটবাড়ির আলোর ঝলসানি। তখন তার ফুটপাথে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পরা অবয়ব। তার হাওয়ায় চায়ের দোকানের ঝাঁপ খোলার ক্যাঁচকোঁচ শব্দ। হলুদ বাষ্প ভেদ করে তারার আলো মাটিতে নামতে পারে না। আস্তে আস্তে কয়লার গুলের ক্ষুন্নিবৃত্তির আগুন জ্বলে ওঠে কৃষ্ণগহ্বরে। কেতলির গায়ে লেগে থাকা ধোয়ার জলটুকু উবে যায়। দোকানের বাইরে ছিটোনো জলে ভিজে ওঠে মাটি। এক কোণে ঝাঁট দিলে জমে ওঠে জঞ্জাল। আলো ফুটে এলে কল্লোলিনী তিলোত্তমার নাগপাশবন্ধন শিথিল হয়ে আসে। ধীরে ধীরে পৃথিবীরা রুপান্তরিত হয়। এক পৃথিবী ঘুমোতে গেলে অন্য আরেক পৃথিবী জেগে ওঠে…।

প্রবল একটা ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল অরণ্যর। ট্রেনের দুলুনিতে সবাই ঘুমে অচেতন। হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল, সাড়ে ছ’টা বাজে। সকাল হয়ে গেছে, টের পাওয়া যাচ্ছে সামনের জানলা দিয়ে তাকালে। পিছনের জানলার ঝাঁপের ফাঁক দিয়ে সকালের রোদ এসে পিঠে লাগছে, টের পেল। খুলল না। অন্য যাত্রীটির ঘুম ভেঙ্গে গেলে সেটা তাঁর অসন্তোষের কারণ হতে পারে। কারোর দিনের শুরু তার জন্যে খারাপ হোক, মোটেও কাম্য নয়।

ট্রেন থামল কোনো স্টেশনে। উঠে মুখ ধুয়ে দরজা দিয়ে গলা বাড়াতেই জমজমাট স্টেশন চত্বর নজরে এলো। কী নাম, সেটা জানা যাবে গাড়ি আরো এগিয়ে গেলে। সামনেই দোকান। নেমে পাঁউরুটি, কেক, ডিমসেদ্ধ, জলের বোতল কিনে নিল। বিস্কুটের প্যাকেটও রাখ্ল কিনে, পরে দরকার হতে পারে। খেয়ে ‘পরে ডাস্টবিনের ভেতরে চালান করল মোড়কগুলোকে। ঠান্ডা ভাব এরই মধ্যে টের পাওয়া যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে গন্তব্য আর খুব বেশি দূরে নেই। ফের উঠে পড়ল কামরায়। সকালের কর্মব্যস্ত স্টেশনের ছুটোছুটি দেখলে বোঝা যায়, নিজের রুটিরুজি কামানোর জন্য মানুষ কতটা ব্যগ্র হতে পারে। ট্রেন ছেড়ে দিলে এসে বসলো নিজের জায়গায়। ওপরের ভদ্রলোক এখনও ওঠেননি, বেশিরভাগ যাত্রীই তাই। কয়েকজন হাতে ব্রাশ-পেস্ট নিয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে বেসিনের কাছে। দু-তিনজন ব্যাজার মুখে পাশের দরজাটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে সীটের নীচ থেকে ব্যাগ টেনে বের করে বই বের করল একখানা। পেছনের গরাদের ফাঁক দিয়ে চেরা চেরা রোদের ফালি এসে পরেছে বইয়ের ওপর। খুব শীঘ্রইগন্তব্যে পৌঁছবে মনে হয়। কতক্ষণ লাগবে, জানেনা। আগ্রহও নেই। এ যাত্রা দরকার নিজের জন্যে। আঁটঘাট বেঁধে প্ল্যানিং নয়। খামখেয়ালী ঘোরা।

বইয়ের শব্দগুলো অনুরণন সৃষ্টি করছিল একধরনের। ট্রেনের ছন্দময়তা তার সাহায্য নিয়ে ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর গভীরে। চারপাশের কৌতুহলী মুখমণ্ডল জরিপ করলেও গ্রাহ্যজ্ঞান ছিল না। এমনটাই হয় প্রতিবার। বই পেলে জগৎ ভোলা যায়। গায়ে টোকা পড়তে সম্বিত ফিরল। সামনে সেই ভদ্রলোক। একগাল হাসি উপহার দিল সে।
-গুড মর্নিং!
-সুপ্রভাত। ঘুম ভালো হয়েছিল তো?
-হেহে। কী যে বল। তা তোমার গন্তব্য এখনো আসেনি?
-না বোধহয়।
-কোথায় নামার প্ল্যান?
-তা তো জানিনা। যেখানে ভালো লাগবে, নেমে পড়ব।
-কী?!
হাঁ হয়ে গেছেন ভদ্রলোক। অরণ্য মুচকি হেসে বলল,
-আপনি চিন্তা করছেন কেন এত? আমি নেমে পড়ব ঠিক। আসলে এমনিই ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছি। বুঝলেন?
-হ্যাঁ, এইবার..

কথা শেষ হলো না, অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন। খুব সম্ভব তার মানসিক স্থিতি নিয়ে সন্দেহ জেগেছে মনে।

-আপনি কোথায় নামবেন?
-কী?
-বললুম আপনি কোথায় নামবেন?
-কেন বলত?
-তাহলে আমিও সেইখানে নেমে যাব।

নিমেষের মধ্যে মুখটা কালো হয়ে গেল ভদ্রলোকের। মজা লাগলো অরণ্যর। আশেপাশের যাত্রীরাও রগড় দেখছে। তাড়া লাগালো,

-কী হলো? বললেন না যে?
-আমি..মানে..এই..হল্দয়ানিতে..
-আচ্ছা!

ভেতর থেকে তেড়ে বেরিয়ে আসা হাসির তোড়টাকে বহু কষ্টে দাবিয়ে রাখল। তার টিকিটও ওই অবধিই। ভদ্রলোক জানেন না, দেখলে খুব একটা খুশি হবেন না সন্দেহ নেই। পা নামিয়ে বসে জানলাটা খুলে দিল। মুক্ত হাওয়া প্রবেশ পথ পেয়ে আলোর সাথে হুহু করে ঢুকতে শুরু করল কুপেটায়। গান মনে পরে গেল একটা। গুন গুন করে গাওয়ার সে ছবি, সুর মনে গেঁথে গেছে।

“আরো আলো, আরো আলো, এই নয়নে প্রভু ঢালো, সুরে সুরে বাঁশি পুরে, তুমি আরো আরো আরো দাও তান, মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ…”

কামরার লোকে অবাক হয়ে দেখছিল কেমন এক তরুণ যুবক সুরে সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে যাচ্ছে…!

খানিক পরে ট্রেন থেমে গেল এক স্টেশনে। ছোট স্টেশন, দুটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম। ওপাশে আরো একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে। খুব সম্ভবত লাইন ফাঁকা নেই। লাইনের ধারে সারি দিয়ে কুঁড়েঘর। খড় আর টালি দিয়ে ছাওয়া। পাতলা পলিথিনের আবরণ ঘরের অন্তর্ভাগ আড়াল করে রেখেছে বাইরে থেকে। কুচো বাচ্চারা ছুটে বেড়াচ্ছে লাইনময়। কয়েকজন লাইন দিয়ে রেলের জলের লাইন থেকে জল ভরছে। সন্তুষ্টি, মনে মনে বলল সে। গরিব ফকির আমির রাজার থেকে অনেক বেশি সুখী হয়। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে লাইনের উপরে খেলতে দিচ্ছেই বা কেন? অন্য ট্রেন চলে আসবে না? উল্টোদিকের জানলা দিয়ে দেখল, অন্য ট্রেন থেকেও যাত্রীরা নেমে গেছে প্ল্যাটফর্মে। ঘুরে বেড়াচ্ছে ইতস্তত। সেও নেমে গেল। খানিকদূর হেঁটে গেলে একজনের সাথে আলাপ করে জানলো, এখানে কখন লাইন ফাঁকা হবে জানা নেই। সিঙ্গেল লাইন, অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। অন্য ট্রেনটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন। সহযাত্রীদের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই, নিজেদের মতন হাসছে, খেলছে, ঠাট্টা তামাশা করে চলেছে। দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হয়, প্রতিটা ট্রেন শুধু মাত্র যানবাহন নয়! এক এক গাড়ি অনুভূতি। কত লোকের নিত্য সহযাত্রা , প্রতিদিনের রুজিরুটির ঠিকানা, পেশা-নেশা জড়িয়ে আছে এক একটা গাড়িকে ঘিরে! এক কামরা অনুভূতিকে বয়ে নিয়ে যায় লৌহযান, রোজ রোজ..

হুইশল পড়তে খেয়াল হল। সব যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়তে পড়তেই গতি বাড়াতে শুরু করল যন্ত্রদানব। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর নিজস্ব ছন্দে ভাঙ্গতে শুরু করল চড়াই। খাড়া রেলপথ উঠে গেছে, তা বেয়ে উঠতে উঠতে দেখতে পেল খেলতে থাকা বাচ্চাগুলো একগাল হাসি নিয়ে টাটা করছে। সেও

পাল্টা হাত নাড়ল ওদের দেখে।
মনটা ভালো হয়ে গেল অরণ্যর।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s